পৌরনীতি শব্দের অর্থ কি?


প্রশ্নঃ পৌরনীতি শব্দের অর্থ কী?

ভূমিকা: মানুষ সামাজিক জীব। স্বভাবতই মানুষ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতে পারে না। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ স্ত্রী-পুত্র-পরিজন এবং স্নেহ-প্রেম-প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। এ কারণেই মানুষ আপনজনদের নিয়ে একত্রে বাস করতে চায়। স্নেহ ও ভালোবাসার প্রত্যাশী মানুষ সঙ্গপ্রিয়তার কারণেই সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। সমাজ ছাড়া সে বাস করতে পারে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল এজন্যই বলেছেন, “মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব; আর যে সমাজে বসবাস করে না, সে হয় দেবতা, নয়তো পশু।”

সুদূর অতীতে সমাজবদ্ধ মানুষের নাগরিক জীবনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতি প্রচলিত ছিল। বর্তমান সময়েও সমাজবদ্ধ মানুষের নাগরিক জীবনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা নিয়ম-কানুন, রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠান। নাগরিক জীবনের এসব দিক নিয়ে আলোচনার জন্য গড়ে উঠেছে জ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা, যা আজ Civics বা ‘পৌরনীতি’ নামে পরিচিত। এজন্য পৌরনীতিকে নাগরিকতা বিষয়ক বিজ্ঞানও বলা হয়। পৌরনীতি ও সুশাসন মূলত একটি সামাজিক বিজ্ঞান।

পৌরনীতির ধারণা ও সংজ্ঞা (Concept and Definition of Civics):
ইংরেজি ‘Civics’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ‘পৌরনীতি’। ‘Civics’ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘Civis’ এবং ‘Civitas’ থেকে। ‘Civis’ ও ‘Civitas’ শব্দের অর্থ যথাক্রমে ‘নাগরিক’ এবং ‘নগররাষ্ট্র’ (City-State)। সুতরাং শব্দগত অর্থে ‘Civics’ বা পৌরনীতি হলো নগররাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের আচরণ ও কার্যাবলি সম্পর্কিত বিজ্ঞান। প্রাচীন ভারতবর্ষ ও গ্রিসে শব্দগত বা মূলগত অর্থেই পৌরনীতি বলতে নাগরিকের অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত বিষয়কে বোঝানো হতো।

সংস্কৃত ভাষায় নগরকে ‘পুর’ বা ‘পুরী’ এবং নগরের অধিবাসীদের ‘পুরবাসী’ বলা হয়। এ কারণেই নাগরিক জীবনের আরেক নাম ‘পৌর জীবন’ এবং নাগরিক জীবন সম্পর্কিত বিদ্যার নাম ‘পৌরনীতি’।

প্রাচীন গ্রিসে প্রতিটি নগর ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্স ও স্পার্টা প্রভৃতি নগররাষ্ট্রগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা ছিল সীমিত। নগররাষ্ট্রের সকল সদস্যকে নাগরিক বলা হতো না। কেবল যারা রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করত, তাদেরই ‘নাগরিক’ বলা হতো। নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করা হতো পৌরনীতিতে। সুতরাং শব্দগত বা মূলগত অর্থে পৌরনীতির অর্থ ছিল অনেকটাই সীমিত ও সংকীর্ণ।

কিন্তু বর্তমানে পৌরনীতিকে কেবল শব্দগত অর্থে আলোচনা করা হয় না। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রগুলো প্রাচীন গ্রিসের ‘নগররাষ্ট্র’ (City-State) নয়; বরং এগুলো ‘জাতিরাষ্ট্র’ (Nation-State)। প্রাচীন গ্রিক নগররাষ্ট্রের তুলনায় আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলো আয়তনে বৃহৎ এবং জনসংখ্যায় বিপুল। আধুনিক জাতিরাষ্ট্রে নাগরিকের ধারণাও পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে নাগরিক হলো সেই ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, রাষ্ট্রের প্রতি নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করেন এবং রাষ্ট্র-স্বীকৃত সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ভোগ করেন। এসব জাতিরাষ্ট্রে নাগরিকদের জীবন ও কার্যাবলি বহুমুখী এবং জটিল। আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের আচরণ, কার্যাবলি এবং তাদের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে যে শাস্ত্র আদর্শ নাগরিক জীবনের নির্দেশনা প্রদান করে, তাই হলো ‘Civics’ বা ‘পৌরনীতি’। পৌরনীতি মূলত সামাজিক বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নাগরিক জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানীয়, জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ নিয়ে যে জ্ঞানের শাখা আলোচনা করে, তাকে পৌরনীতি বলে। পৌরনীতি নাগরিক হিসেবে মানুষের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করে; মানুষের কার্যাবলি, অভ্যাস ও আচরণ বিশ্লেষণ করে; এবং রাষ্ট্র ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যালোচনার মাধ্যমে আদর্শ নাগরিক জীবনের শিক্ষা প্রদান করে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন