প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির শ্রেণীবিভাগ আলোচনা কর


প্রশ্ন : প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির শ্রেণীবিভাগ আলোচনা কর।

ভূমিকা :
ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রথাগত বিধান ও শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি। ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি এই সাংবিধানিক রীতিনীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke) বলেছেন— “The convention is the moving power of the British Constitution.”
ব্রিটেনের অলিখিত শাসনতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো বিস্তৃতভাবে বিদ্যমান।

প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির শ্রেণীবিভাগ : অধ্যাপক জেনিংস (Jennings) ব্রিটেনের প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলোকে প্রধানত চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা—
১. মন্ত্রিসভা সম্পর্কিত প্রথাগত বিধান
২. রাজার ক্ষমতার সাথে জড়িত প্রথাগত বিধান
৩. পার্লামেন্টের কার্যাবলি সম্পর্কিত প্রথাগত বিধান
৪. ডোমিনিয়ন দেশসমূহের সাথে জড়িত প্রথাগত বিধান

নিম্নে পর্যায়ক্রমে এগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো—

১. মন্ত্রিসভা সম্পর্কিত প্রথাগত বিধান :
ক. মন্ত্রিসভা কমন্সসভার নিকট দায়ী থাকেন এবং কমন্সসভায় অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হলে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।
খ. মন্ত্রীরা সম্মিলিতভাবে কমন্সসভার নিকট দায়ী থাকেন। একজন মন্ত্রী পদত্যাগ করলে তার সাথে সমগ্র মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।
গ. মন্ত্রিসভার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পদত্যাগ করলে সরকারও পদত্যাগ করতে বাধ্য থাকে।
ঘ. পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া মন্ত্রিসভা যে কোনো সন্ধি সম্পাদন করতে পারে; তবে বাস্তবে কোনো মন্ত্রিসভাই কমন্সসভার অনুমতি ছাড়া সন্ধি করতে সাহস করে না।
ঙ. কোনো মন্ত্রিসভা পরাজিত হয়ে পদত্যাগ করলে রাজা বা রানী প্রথমে বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শ করেন।
চ. প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে রাজা বা রানী পার্লামেন্ট ভেঙে দেবেন।

২. রাজার ক্ষমতার সাথে জড়িত প্রথাগত বিধান :
ক. প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের অব্যবহিত পরে রাজা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে মন্ত্রিপরিষদ গঠন করার জন্য আহ্বান করবেন।
খ. রাজা তাঁর ভেটো ক্ষমতা কখনো প্রয়োগ করেন না। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষ কর্তৃক কোনো বিল পাস হলে তা রাজার সম্মতির জন্য উপস্থাপন করা হয়।
গ. রাজা ইংল্যান্ডের সকল সরকারি কর্মচারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে পারেন, তবে তা কেবল অক্ষমতা বা দুর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
ঘ. সকল রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম রাজার নামে পরিচালিত হয়।

৩. পার্লামেন্টের কার্যাবলি সম্পর্কিত প্রথাগত বিধান :
ক. ইংল্যান্ডের লর্ডসভা সর্বোচ্চ আপিল আদালত। লর্ডসভা যখন আপিল আদালত হিসেবে বিচারকার্য পরিচালনা করে, তখন আইনবিশারদ লর্ড ব্যতীত অন্য লর্ডগণ উপস্থিত থাকেন না।
খ. কোনো বিল পাস করতে হলে তা পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করতে হয়। এ ক্ষেত্রে তিনবার পাঠের রীতি একটি প্রথাগত বিধান।
গ. লর্ডসভা যদি কমন্সসভা কর্তৃক পাসকৃত কোনো বিলের বিরোধিতা করে, তবে রাজা পিয়ার (Peer) সৃষ্টি করে বা পিয়ার সৃষ্টির হুমকি দিয়ে তা নাকচ করতে পারেন।
ঘ. পার্লামেন্টের অধিবেশন বছরে অন্তত একবার অনুষ্ঠিত হবে।
ঙ. হাউস অব কমন্সের স্পিকার দলীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখবেন এবং যতদিন তিনি ঐ পদে থাকবেন, ততদিন অন্য কেউ ঐ পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না।
চ. অর্থ বিল কেবল কমন্সসভায় উত্থাপিত হবে।
ছ. সরকারি দল ও বিরোধী দল পর্যায়ক্রমে বক্তৃতা করবে। “His Majesty’s Opposition” ধারণাটি একটি প্রথাগত বিধান।

৪. ডোমিনিয়ন দেশসমূহের সাথে জড়িত প্রথাগত বিধান :
ক. ডোমিনিয়ন দেশগুলোর সম্মতি ছাড়া ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাদের জন্য কোনো আইন প্রণয়ন করে না।
খ. ডোমিনিয়ন সরকারের মন্ত্রিসভার পরামর্শ ছাড়া রাজা বা রানী ডোমিনিয়নের গভর্নর-জেনারেল নিয়োগ করেন না।
গ. রাজার উত্তরাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডোমিনিয়নের আইনসভার পরামর্শ গ্রহণ করা হয়।
ঘ. ডোমিনিয়নে নিযুক্ত গভর্নর-জেনারেল রাজা বা রানীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
ঙ. ডোমিনিয়ন সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী গভর্নর-জেনারেল পরিচালিত হন।
চ. পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে সময়োপযোগী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির শ্রেণীবিভাগ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির ভূমিকা অপরিসীম। কারণ এসব প্রথা ব্যতীত ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় আইনের অনুশাসনের বাস্তব প্রয়োগ অনুধাবন করা কঠিন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন