ভূমিকা : উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনের সংবিধানের একটি অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো আইনের অনুশাসন (The Rule of Law)। আইনের অনুশাসন একটি প্রাচীন ধারণা হলেও ব্রিটিশ সংবিধানেই সর্বপ্রথম এটি সুসংহতভাবে সাংবিধানিক মর্যাদা লাভ করে। আইনের অনুশাসন ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। সাধারণভাবে আইনের অনুশাসন বলতে আইনের সর্বোচ্চ প্রাধান্য এবং আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতাকে বোঝায়। এ প্রসঙ্গে বলা হয়— “In the eyes of the law, all persons, whether big or small, the highest capitalist or the poorest man, are equal.” ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যবস্থায় আইনের অনুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম।
আইনের অনুশাসনের উৎপত্তি ও বিকাশ: ব্রিটেনে আইনের অনুশাসন একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রাম, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সাংবিধানিক বিকাশের ধারাবাহিক ফল। নিম্নে এর প্রধান ধাপগুলো আলোচনা করা হলো—
ক. এডওয়ার্ড কোকের ভূমিকা: সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজকীয় স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বিখ্যাত বিচারপতি Edward Coke ঘোষণা করেন— “The Common Law of England is supreme over the King.” এর মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন যে রাজা বা রানী আইন의 ঊর্ধ্বে নন। এটি আইনের অনুশাসনের বিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
খ. ম্যাগনা কার্টা (১২১৫): রাজা জন (King John) ও ভূস্বামীদের মধ্যকার বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১২১৫ সালে ম্যাগনা কার্টা (Magna Carta) স্বাক্ষরিত হয়। এই দলিলের মাধ্যমে রাজাকে কিছু নির্দিষ্ট আইনি সীমার মধ্যে আবদ্ধ করা হয় এবং নাগরিকদের কতিপয় মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ম্যাগনা কার্টাকে বলা হয়— “A protest against arbitrary punishment.” এটি আইনের অনুশাসনের ইতিহাসে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সোপান।
গ. রাজা বনাম পার্লামেন্ট দ্বন্দ্ব: সপ্তদশ শতাব্দীতে রাজা ও পার্লামেন্টের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। এর পরিণতিতে সংঘটিত হয় ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব (Glorious Revolution)। এর পর ১৬৮৯ সালে প্রণীত হয় Bill of Rights। এই দলিলের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে—
রাজা আইন ও পার্লামেন্টের অধীন থাকবেন
স্বেচ্ছাচারী শাসনের অবসান ঘটবে
নাগরিক অধিকার সাংবিধানিক সুরক্ষা পাবে
ফলে রাজকীয় ঐশ্বরিক ক্ষমতার পরিবর্তে আইনের অনুশাসন চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
উপসংহার: আইনের অনুশাসন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার রক্ষায় এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। এটি শাসকের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে এবং নাগরিকের স্বাধীনতা ও সমতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনের অনুশাসন তাই কেবল একটি নীতিমাত্র নয়, বরং নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্রের ভিত্তি। সুতরাং বলা যায়, আইনের অনুশাসন ব্রিটিশ সংবিধানের একটি অপরিহার্য ও ঐতিহাসিকভাবে বিকশিত মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন