আইনের অনুশাসন সম্পর্কে ডাইসির মতবাদ ব্যাখ্যা কর


প্রশ্ন: আইনের অনুশাসন সম্পর্কে ডাইসির মতবাদ ব্যাখ্যা কর।

ভূমিকা : রোমান দার্শনিক সিসেরোর মতে, “আইনের অনুশাসন হল সভ্যতার ভিত্তি”। ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই উক্তিটি যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবিধান অলিখিত হওয়ায় নাগরিকের মৌলিক অধিকারসমূহ এখানে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে ব্রিটেনের নাগরিকরা মৌলিক অধিকার ভোগ করে না; বরং অন্যান্য দেশের তুলনায় তারা অধিক অধিকার ভোগ করে থাকে। আর এই অধিকারগুলোর প্রধান উৎস হলো আইনের অনুশাসন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জ্যারল্ড জিংক যথার্থই বলেছেন, “ব্রিটেনের সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলোর মধ্যে আইনের অনুশাসনই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।”

আইনের অনুশাসন সম্পর্কে ডাইসির ব্যাখ্যা : ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এ. ভি. ডাইসি আইনের অনুশাসন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রদান করেন। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত তাঁর An Introduction to the Law of the Constitution গ্রন্থে তিনি আইনের অনুশাসন সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা উপস্থাপন করেন। আইনের অনুশাসন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডাইসি মূলত ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী চিন্তাধারার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আইনের অনুশাসনের মাধ্যমে ব্যক্তিস্বাধীনতার পূর্ণতা দান। এ লক্ষ্যেই তিনি আইনের অনুশাসনকে ব্রিটিশ সংবিধানের মৌল নীতি হিসেবে অভিহিত করেন।

ডাইসি আইনের অনুশাসনের তিনটি মূল নীতির কথা উল্লেখ করেছেন। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো—

১. আইনের প্রাধান্য: ডাইসির মতে, সাধারণ আইন ও নিয়মিত আদালতের মাধ্যমে আইনভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে দৈহিক বা বৈষয়িক দিক থেকে শাস্তি প্রদান করা যায় না। তাঁর ভাষায়— “…no man is punishable or can be lawfully made to suffer in body or goods except for a distinct breach of law established in the ordinary legal manner before the ordinary courts of the land.”

তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র যদি স্ববিবেচনামূলক ক্ষমতার মাধ্যমে কাউকে শাস্তি দেয়, তবে তা আইনের অনুশাসনের পরিপন্থী। ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কেবল আইনভঙ্গের ক্ষেত্রেই শাস্তি দেওয়া হয়—অন্য কোনো কারণে নয়। এ প্রসঙ্গে ডাইসি বলেন— “Englishmen are ruled by the law, and by the law alone; a man may be punished for a breach of law, but he can be punished for nothing else.”

২. আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান: আইনের অনুশাসনের দ্বিতীয় নীতি হলো আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমতা। এই নীতির মাধ্যমে ডাইসি ফ্রান্সের প্রশাসনিক আইন ব্যবস্থার সঙ্গে ব্রিটেনের আইনি ব্যবস্থার পার্থক্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, সামাজিক মর্যাদা বা পদ-পদবির কারণে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ কনস্টেবল—সবাই একই আইনের অধীন।

ডাইসির ভাষায়— “With us, every official, from the Prime Minister down to a constable or a collector of taxes, is under the same responsibility for every act done without legal justification as any other citizen.”

৩. জনগণের অধিকার সাধারণ আইন দ্বারা সংরক্ষিত: ডাইসির মতে, আইনের অনুশাসনের তৃতীয় নীতি হলো জনগণের অধিকার সাধারণ আইন দ্বারা সংরক্ষিত হওয়া। অন্যান্য দেশে নাগরিক অধিকার সংবিধানের বিধিবদ্ধ আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত হলেও ব্রিটেনে সংবিধান অলিখিত হওয়ায় এখানে নাগরিক অধিকার আদালতের রায় ও বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। অর্থাৎ বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তই নাগরিক অধিকারের প্রধান উৎস।

ডাইসির ভাষায়—
“The law of the constitution… is not the source but the consequence of the rights of individuals as defined and enforced by the courts.”

সমালোচনা : আইনের অনুশাসন সম্পর্কে ডাইসির মতবাদ তার সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তীকালে জেনিংস, লাস্কি, রবসন প্রমুখ চিন্তাবিদ এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। প্রধান সমালোচনাগুলো নিম্নরূপ—

১. আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থায় আইনের অনুশাসনের অর্থ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
২. ডাইসি শাসন বিভাগীয় বা অর্পিত আইনকে যথাযথ গুরুত্ব দেননি।
৩. আধুনিক ব্রিটেনে সরকার ব্যাপক স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার অধিকারী।
৪. প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার পুরোপুরি রোধ করা যায় না।
৫. ব্রিটেনে আইন নয়, পার্লামেন্টই প্রকৃত সার্বভৌম—যা ডাইসির মতের পরিপন্থী।
৬. বাস্তবে আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান নয়; বহু ক্ষেত্রে বিশেষাধিকার বিদ্যমান।
৭. অনেক অধিকার বিধিবদ্ধ আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট ও সংরক্ষিত, যা ডাইসি উপেক্ষা করেছেন।
৮. প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা আইনের প্রাধান্যকে সীমিত করেছে।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ডাইসির ‘আইনের অনুশাসন’ তত্ত্বটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পুরোপুরি প্রযোজ্য না হলেও এর ঐতিহাসিক ও নৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। উদারনৈতিক গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় এই তত্ত্ব আজও একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ব্রিটিশ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ডাইসির আইনের অনুশাসন নীতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন