মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা বলতে কী বুঝ?


প্রশ্ন : মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা বলতে কী বুঝ?

ভূমিকা : সংসদীয় বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতার নীতি’। ব্রিটেনে এই নীতি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা শাসনসংক্রান্ত সকল কার্যাবলির জন্য পার্লামেন্টের নিকট জবাবদিহি করে থাকে। পার্লামেন্টের কাছে মন্ত্রিসভার এই জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াকেই মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা বলা হয়। ফলে মন্ত্রিসভা তার ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো কাজ করতে পারে না। মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতার নীতি সম্পর্কে স্যামুয়েল বীর মন্তব্য করেন, “প্রত্যেক মন্ত্রী দুইটি টুপি পরিধান করে থাকেন।” এই দায়িত্বশীলতার কারণেই ব্রিটেনের সরকারকে দায়িত্বশীল সরকার বলা হয়। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় একজন মন্ত্রী একদিকে নিজ বিভাগের জন্য ব্যক্তিগত দায়িত্বের টুপি পরেন, অন্যদিকে কেবিনেট সদস্য হিসেবে যৌথ দায়িত্বের টুপি পরেন। ব্যক্তিগত ও যৌথ দায়িত্বের ওপর ভিত্তি করেই মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতার তত্ত্ব গড়ে উঠেছে।

মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা: ব্রিটিশ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত কমন্সসভার নিকট মন্ত্রিসভা দায়ী থাকার নামই মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা। কেননা ব্রিটেনে সরকার দায়িত্বহীনভাবে কোনো কাজ করতে পারে না কিংবা আইনসংগত বিপুল ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে না।

মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা সম্পর্কে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন। A. B. Birch (বার্চ) মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা বলতে নিম্নের তিনটি বিষয়কে বুঝিয়েছেন, যথা—
১. সরকার দায়িত্বহীনভাবে কখনো কোনো কাজ করে না;
২. সরকার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত অনুসরণ করে; এবং
৩. সরকার সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য পার্লামেন্টের নিকট দায়িত্বশীল থাকে।

Sir Ivor Jennings বলেছেন— “The peculiar contribution of the British Constitution to political science is not so much representative government … as responsible government.”

ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতা প্রধানত দুই প্রকার—
ক. ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং
খ. যৌথ দায়িত্ব।

ক. ব্যক্তিগত দায়িত্ব: সাধারণত প্রত্যেক মন্ত্রীই কোনো না কোনো বিভাগের দায়িত্বে থাকেন। ব্যক্তিগত দায়িত্ব বলতে বোঝায়, প্রত্যেক মন্ত্রীকে তাঁর বিভাগের রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে সকল কার্যাবলির জন্য কমন্সসভার নিকট দায়ী থাকতে হয়। যদিও অধিকাংশ কাজ সরকারি কর্মচারীরা সম্পাদন করেন, তবুও সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব মন্ত্রীর ওপরই ন্যস্ত থাকে এবং তিনি ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। কমন্সসভায় উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীকেই দিতে হয়। কোনো মন্ত্রী ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তাকে অপসারণ করা হতে পারে।

খ. যৌথ দায়িত্ব: সরকারি নীতি, সিদ্ধান্ত ও সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য কমন্সসভার নিকট সমষ্টিগতভাবে মন্ত্রীদের যে দায়িত্ব থাকে, তাকে যৌথ দায়িত্ব বলা হয়। মূলত যৌথ দায়িত্বশীলতা বলতে পার্লামেন্টের কাছে সমগ্র কেবিনেটের দায়িত্বকে বোঝায়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, কেবিনেট শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতার নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত রীতি। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা শাসনসংক্রান্ত সকল কার্যাবলির জন্য পার্লামেন্টের নিকট জবাবদিহি করে থাকে। পার্লামেন্টের কাছে মন্ত্রিসভার এই জবাবদিহিতার প্রক্রিয়াকেই মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা বলা হয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন