ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটিসমূহের গুরুত্ব আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটিসমূহের গুরুত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকা : আধুনিক রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন পদ্ধতির সঙ্গে কমিটি ব্যবস্থা (Committee System) অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেননা প্রত্যেক দেশেই আইনসভার অধিকাংশ কার্যক্রম বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তথা কমন্সসভাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। সাধারণত কমন্সসভার যেকোনো বিলের দ্বিতীয় পাঠের পর, অর্থাৎ বিলটির মূলনীতি সম্পর্কে কমন্সসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অব্যবহিত পরই বিলটি বিশদ বিচারের জন্য কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়। কাজেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কমিটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটিসমূহের গুরুত্ব : ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তথা কমন্সসভার কমিটিসমূহের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা নিম্নে আলোচনা করা হলো—

প্রথমত, বর্তমানে আইন প্রণয়নের পদ্ধতি ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ছে। আইনসভার বিভিন্ন কার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ দক্ষতা ও নৈপুণ্যের প্রয়োজন। আইনসভার অভিজ্ঞ সদস্যদের নিয়ে বিভিন্ন কমিটি গঠিত হলে বিভিন্ন বিষয়ে এসব কমিটির পর্যালোচনা ও সুচিন্তিত অভিমত আইনসভার দক্ষতা ও নৈপুণ্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

দ্বিতীয়ত, বহু সদস্যবিশিষ্ট আইনসভার পক্ষে সকল বিষয় বিস্তৃতভাবে আলোচনার পর সহজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। প্রত্যেক সদস্যের পক্ষেও নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকে না। কমিটির সদস্যসংখ্যা কম হওয়ায় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়ে ওঠে। প্রত্যেক সদস্যের মতামত প্রকাশেরও সুযোগ থাকে। এর ফলে সদস্যদের সক্রিয়তা ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি পায়।

তৃতীয়ত, কমিটি ব্যবস্থা আইনসভার দায়িত্বের বোঝা লাঘব করে। বিভিন্ন কমিটির সুচিন্তিত অভিমতের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণ আইনসভার পক্ষে সহজ হয়ে ওঠে।

চতুর্থত, আইনসভার অধিবেশন বছরে নির্দিষ্ট সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু কমিটিসমূহ সারা বছর নিজ নিজ সংশ্লিষ্ট বিষয় ও সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এভাবে কমিটিসমূহের মাধ্যমে অধিবেশন স্থগিত থাকাকালীনও আইনসভার কার্যক্রম পরোক্ষভাবে অব্যাহত থাকে।

পঞ্চমত, আইনসভার কমিটিসমূহে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা থাকায় এবং কোথাও কোথাও কমিটির চেয়ারম্যান পদে বিরোধী দলের কোনো সদস্যকে নিয়োগের রীতি থাকায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

ষষ্ঠত, আইনসভার কমিটিসমূহ রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। আইনসভায় দলীয় নীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ অনেক সময় চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। বিভিন্ন কমিটিতেও এ রাজনৈতিক বিরোধ ও মতপার্থক্যের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু প্রত্যেক দলই নিজের বক্তব্য বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন এবং অন্যের বক্তব্য যথাযথভাবে অনুধাবনের সুযোগ পায়। এর ফলে মতপার্থক্যের তীব্রতা হ্রাস পায় এবং কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে মতপার্থক্যের অবসান ঘটানো সম্ভব হয়। কমিটির মতৈক্য অনেক ক্ষেত্রে আইনসভার কার্যাবলি ও বিতর্কেও প্রতিফলিত হয়।

সপ্তমত, আধুনিক রাষ্ট্রে আইনসভার কমিটিসমূহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয় সঠিকভাবে অনুধাবনের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা, আইনসভার সদস্য এবং জনসাধারণের সাক্ষ্য গ্রহণ করা। সীমিত পরিসরে এসব কমিটি জনসাধারণ ও প্রশাসনের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কমিটিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিটিগুলোর বিস্তারিত আলোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ এবং সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইনের উৎকর্ষ সাধিত হয়। যদিও অনেকের মতে, কমিটির মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ফলে পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ ভূমিকার গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবুও প্রকৃতপক্ষে কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকার কারণে পার্লামেন্টের কাজ অনেক সহজ, সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ হয়েছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন