ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা কর।

ভূমিকা: বর্তমান ব্রিটিশ প্রশাসনে বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের যে বিকশিত রূপ পরিলক্ষিত হয়, তা একদিনে গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন পরিবর্তন, সংস্কার এবং প্রয়োজনের তাগিদে ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ: নিম্নে ধারাবাহিকভাবে ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের উদ্ভব ও বিকাশ আলোচনা করা হলো—

১. প্রাথমিক পর্যায় (স্যাক্সন ও নর্মান যুগ): ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার প্রাথমিক পর্যায়ে, বিশেষ করে স্যাক্সন ও নর্মান আমলে, সরকারি কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজা বা রানি তাঁদের মনোনীত কিছু ব্যক্তির ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেন। এর ফলে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদের সৃষ্টি হয়। এসব পদের মধ্যে স্টুয়ার্ড (Steward), মার্শাল (Marshal), সেক্রেটারি (Secretary), চেম্বারলেইন (Chamberlain) এবং ট্রেজারার (Treasurer) উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান, তথ্য সংরক্ষণ এবং হিসাবরক্ষণসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের জন্য করণিক নিয়োগের প্রচলন শুরু হয়।

২. অষ্টাদশ শতক: অষ্টাদশ শতকে শিল্পবিপ্লবের ফলে ব্রিটেনে পুঁজিবাদের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যেরও বিস্তার লাভ করে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অধিক সংখ্যক সরকারি কর্মচারীর প্রয়োজন দেখা দেয়। এ সময় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী নিয়োগের প্রচলন ছিল।

৩. ঊনবিংশ শতক: ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রশাসনের উচ্চপদগুলোতে প্রধানত সম্ভ্রান্ত ও সামন্তশ্রেণির ব্যক্তিদের প্রাধান্য ছিল। কিন্তু শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটেনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পুঁজিপতি বুর্জোয়া শ্রেণি ক্রমশ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে এবং প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি জোরদার হয়।

এরই ফলশ্রুতিতে ১৮৫৪ সালে নর্থকোট-ট্রেভেলিয়ান রিপোর্ট (Northcote–Trevelyan Report) প্রকাশিত হয়। এ প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারী নিয়োগে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, মেধার ভিত্তিতে পদোন্নতি, সুসংগঠিত নিয়োগব্যবস্থা এবং প্রশাসনে বৌদ্ধিক দক্ষতার ওপর গুরুত্ব আরোপের সুপারিশ করা হয়।

৪. বিংশ শতক: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটেনে প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যাপক সংস্কার শুরু হয়। রাষ্ট্রের কার্যপরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের সরকারি কাজে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস চালু করা হয়।

ফুলটন কমিটি (Fulton Committee) ১৯৬৮ সালে সরকারি কর্মচারীদের নিয়োগ, পরীক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রদান করে। এ প্রতিবেদনের প্রধান সুপারিশগুলো ছিল—

ক. সরকারি কর্মচারী নিয়োগের জন্য সিভিল সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট (Civil Service Department) গঠন।
খ. সিভিল সার্ভিস ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন।
গ. লিখিত পরীক্ষা ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাই।
ঘ. প্রার্থীদের বৌদ্ধিক যোগ্যতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, লিখিত পরীক্ষার ফল এবং ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নের ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান।
ঙ. সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের জন্য সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা।
চ. নীতিনির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের অগ্রাধিকার প্রদান।

ব্রিটেনের সিভিল সার্ভিসের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মান অত্যন্ত উচ্চ এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ। একবার কোনো ব্যক্তি সিভিল সার্ভিসে নিয়োগপ্রাপ্ত হলে নির্ধারিত অবসর বয়স পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে অবসরভাতা লাভ করেন।

৫. বর্তমান অবস্থা: বর্তমানে ব্রিটেনে সরকারি কার্যক্রমের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কিছু প্রশাসনিক কাজ বেসরকারি ব্যবস্থাপনা বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কাছে অর্পণ করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি আমলাদের কাজের পরিধি কিছুটা পুনর্বিন্যস্ত হয়েছে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বর্তমান ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম ও জনসেবার পরিধি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ, নিরপেক্ষ ও পেশাদার সিভিল সার্ভিসের গুরুত্বও বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রিটেনের সিভিল সার্ভেন্টরা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সরকার পরিবর্তিত হলেও তাঁদের প্রশাসনিক অবস্থান অপরিবর্তিত থাকে, যা ব্রিটিশ প্রশাসনিক ব্যবস্থার অন্যতম শক্তি।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন