তুলনামূলক রাজনীতি অধ্যয়নে আচরণবাদের সুবিধাসমূহ আলোচনা কর


প্রশ্ন: তুলনামূলক রাজনীতি অধ্যয়নে আচরণবাদের সুবিধাসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা: তুলনামূলক রাজনীতি বিশ্লেষণের অগ্রগতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এর অধ্যয়নে নানা মতবাদ ও পদ্ধতির বিকাশ ঘটেছে। এর মধ্যে আচরণবাদ অন্যতম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এ তত্ত্ব ব্যাপক প্রসার লাভ করলেও এর উৎপত্তি আরও আগেই ঘটে। এই তত্ত্বের মূল লক্ষ্য হলো তত্ত্ব ও গবেষণার পারস্পরিক নির্ভরশীল কাঠামো গড়ে তুলে রাজনীতি অধ্যয়নে সনাতন, ঐতিহাসিক, বর্ণনামূলক ও আইনগত পদ্ধতিকে অতিক্রম করা।

আচরণবাদ: আচরণবাদ হলো মানুষের আচরণকে বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজনীতিকে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস। পরীক্ষণলব্ধ ও প্রয়োগযোগ্য তত্ত্ব উদ্ভাবন, রীতিসিদ্ধ বিশ্লেষণ এবং তাদের সত্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যক্রমের সুসমন্বিত প্যাটার্ন অনুসন্ধানই আচরণবাদের লক্ষ্য।

জেমস চার্লস ওয়ার্থ তার Contemporary Analysis of Political Behaviour গ্রন্থে বলেছেন, “আচরণবাদ কেবল ব্যক্তির কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত নয়; এটি তার আচরণগত, অনুভূতিজনিত ও মূল্যায়নমূলক প্রক্রিয়ার সাথেও সংশ্লিষ্ট।”

মূলত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের পর্যবেক্ষণযোগ্য আচরণ অধ্যয়ন এবং বিষয়বস্তু বিশ্লেষণে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির প্রয়োগই আচরণবাদের প্রধান ভিত্তি।

তুলনামূলক রাজনীতি অধ্যয়নে আচরণবাদের সুবিধাসমূহ

সনাতন পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা দূর করার উদ্দেশ্যেই আচরণবাদের উদ্ভব। তাই তুলনামূলক রাজনীতি বিশ্লেষণে এটি বহু সুবিধা প্রদান করে। সেগুলো নিম্নরূপ—

১. মানুষের আচরণের মাধ্যমে রাজনীতির ব্যাখ্যা: আচরণবাদীদের রাজনীতি বিশ্লেষণের প্রধান উপাদান হলো “মানুষ”। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, লক্ষ্য, বিশ্বাস, অঙ্গীকার ও মূল্যবোধ বিবেচনায় রেখে তারা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অর্থপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করে। কারণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সরাসরি মানুষের আচরণের ওপর নির্ভরশীল।

২. মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা: আচরণবাদীরা গবেষকের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ, প্রত্যাশা বা নৈতিকতা বিশ্লেষণ থেকে পৃথক রাখেন। ফলে ব্যাখ্যা হয় নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক, যা রাজনীতিকে বাস্তবিকভাবে বুঝতে সহায়তা করে।

৩. বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা: মানুষের আচরণে বিদ্যমান সমরূপতার ভিত্তিতে আচরণবাদে বিভিন্ন অনুমান ও তত্ত্ব গঠন সম্ভব হয়। এসব তত্ত্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে বিজ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

৪. বাস্তবভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান: আচরণবাদ বাস্তব ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাজনীতির ব্যাখ্যা প্রদান করে। সনাতন পদ্ধতির মতো কেবল বর্ণনামূলক বা আইনগত ব্যাখ্যার পরিবর্তে বাস্তবতার আলোকে রাজনৈতিক ঘটনাবলি বিশ্লেষণ সম্ভব হয়।

৫. কৌশল ও প্রযুক্তির প্রয়োগ: রাজনীতি বিশ্লেষণে আচরণবাদ গণিত, পরিসংখ্যান, জরিপ পদ্ধতি, প্রায়োগিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির ব্যবহার করে। ফলে রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান ও তত্ত্ব যাচাই আরও নির্ভুল হয়।

৬. অপ্রাতিষ্ঠানিক বিষয়সমূহের পর্যালোচনা: রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক উপাদান—যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মনোভাব, মতামত, মূল্যবোধ—বিশ্লেষণে আচরণবাদ বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ফলে তুলনামূলক বিশ্লেষন আরও স্পষ্ট হয়।

৭. সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের সুযোগ: তুলনামূলক রাজনীতিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহ যাচাই ও বিশ্লেষণে আচরণবাদ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ব্যবহৃত কৌশলের মাধ্যমে সিদ্ধান্তকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা সম্ভব।

৮. আন্তঃবিষয়ক ব্যাখ্যা প্রদান: আচরণবাদ রাজনীতি বিশ্লেষণে অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও মনোবিজ্ঞানের উপাদান অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে রাজনীতি সম্পর্কে বিস্তৃত ও আন্তঃবিষয়ক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

৯. রাজনীতির পরিবর্তনশীলতা ব্যাখ্যা: আচরণবাদ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনশীল প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে। ফলে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক গতিশীলতা বোঝা সহজ হয় এবং স্থিতিশীলতার কারণও নির্ণয় করা যায়।

১০. ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা প্রদান: আচরণবাদ কেবল বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে না, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দিক-নির্দেশনাও দেয়। সনাতন পদ্ধতিতে এ ধরনের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব ছিল না।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, আচরণবাদের সুবিধা বহুমাত্রিক এবং তুলনামূলক রাজনীতি বিশ্লেষণে অত্যন্ত কার্যকর। যদিও এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আচরণবাদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

Post a Comment

أحدث أقدم