ব্রিটেনের আইন এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির পার্থক্য বাস্তব কি না—আলোচনা কর


প্রশ্ন : ব্রিটেনের আইন এবং সাংবিধানিক রীতিনীতির পার্থক্য বাস্তব কি না—আলোচনা কর।

ভূমিকা : সাংবিধানিক প্রথা বা রীতিনীতির উপরই ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থা আবর্তিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে সাংবিধানিক রীতিনীতির প্রকৃতি ও ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতির মধ্যে আনুষ্ঠানিক ও কার্যগত পার্থক্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। ব্রিটেনের আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতি কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার বিধি ও পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; রাজনৈতিক মতবাদ ও বাস্তব প্রয়োজনীয়তাও এদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাছাড়া বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য কতটুকু প্রতিফলিত হয়—সে বিষয়টিও পর্যালোচনা করা জরুরি।

পার্থক্য বাস্তব কি না : অনেকের মতে ব্রিটেনের আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতির মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাস্তবে এদের মধ্যে প্রকৃত কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। কারণ প্রচলিত পার্থক্যগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহ্যিক বা আনুষ্ঠানিক; তাত্ত্বিক ও কার্যগত দিক থেকে নয়। এ বিষয়টি নিম্নোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়—

প্রথমত, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত আইন সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট হলেও সব শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি যে অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট—এ ধারণা সঠিক নয়। বাস্তবে অনেক সাংবিধানিক রীতিনীতি আইনের মতোই সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট।

দ্বিতীয়ত, সংবিধান বিশেষজ্ঞ আইভার জেনিংস (Ivor Jennings) বলেছেন—
“The conventional system of the British Constitution is in fact much like the system of the common law.”
অতএব মর্যাদাগত দিক থেকে আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতির মধ্যে কঠোর পার্থক্য করা যুক্তিসংগত নয়।

তৃতীয়ত, অনেক ক্ষেত্রেই আইন ও শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ তারা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই পরস্পরের উপর নির্ভরশীল এবং পরিপূরক ভূমিকা পালন করে।

চতুর্থত, আইন মানেই যে আদালতের মাধ্যমে সর্বদা প্রয়োগযোগ্য—এ ধারণাও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় এমন বহু আইন রয়েছে, যেগুলো আদালতের প্রত্যক্ষ এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না।

পঞ্চমত, পরিবর্তনশীলতার ক্ষেত্রেও আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতির মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। উভয়ই সময়, প্রয়োজন ও পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়।

ষষ্ঠত, আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতি—উভয়ই মূলত জনগণের সম্মতি ও সমর্থনের উপর নির্ভরশীল।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, বাস্তবে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতির মধ্যে প্রকৃত কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। হার্ভে ও ব্যাথার (Harvey and Bather) তাঁদের “The British Constitution” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—
“নৈতিক দিক থেকে সাংবিধানিক রীতিনীতি বাধ্যতামূলক। চূড়ান্ত বিচারে ইংল্যান্ডের আইন ও শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি হলো ইংরেজ জাতির জাতীয় চরিত্র ও দর্শনের প্রকাশ।”
প্রকৃতপক্ষে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতি—উভয়ের ভূমিকাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই ব্রিটিশ জনগণ আইন যেমন শ্রদ্ধা করে ও মেনে চলে, তেমনি শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি বা প্রথাগত বিধানকেও সমানভাবে শ্রদ্ধা করে ও অনুসরণ করে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন