কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর


প্রশ্ন: কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ কর।

ভূমিকা: গ্রেট ব্রিটেনের কেবিনেট ব্যবস্থার আলোচনায় কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের সম্পর্কের প্রকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপাতদৃষ্টিতে কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদকে সমগোত্রীয় মনে করা হয়। কিন্তু উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। কারণ কেবিনেট মন্ত্রিপরিষদের একটি অংশমাত্র, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সকল মন্ত্রী নিয়ে গঠিত বৃহত্তর সংস্থা। প্রথমদিকে ব্রিটেনে কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল না; তখন সকল মন্ত্রীকেই কেবিনেটের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কিন্তু সদস্যসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমে কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। (W. B. Munro, The Governments of Europe, p. 14)

কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে পার্থক্য: ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে গঠনগত ও কার্যগত উভয় দিক থেকেই পার্থক্য বিদ্যমান।

ক. গঠনগত পার্থক্য: 
প্রথমত, সকল মন্ত্রীর সমষ্টিগত সংস্থা হলো মন্ত্রিপরিষদ, যা অনেক ক্ষেত্রে ‘সরকার’ শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আইনত মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন রাজা বা রানি, তবে মনোনয়ন করেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে, কেবিনেট হলো মন্ত্রিপরিষদের একটি ক্ষুদ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রধান দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত।

দ্বিতীয়ত, কেবিনেটের সকল সদস্যই মন্ত্রিপরিষদের সদস্য; কিন্তু মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্য কেবিনেটের সদস্য নন। যেসব মন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজা বা রানীকে পরামর্শ প্রদানের জন্য মনোনীত করেন, তারাই কেবিনেট সদস্য হন।

তৃতীয়ত, মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয় কেবিনেট মন্ত্রী ছাড়াও রাষ্ট্রমন্ত্রী, লর্ড চ্যান্সেলর, সংসদীয় অধস্তন অর্থসচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, সলিসিটর জেনারেল, কম্পট্রোলার, ভাইস-চেম্বারলেইন প্রমুখকে নিয়ে। অন্যদিকে, কেবিনেট গঠিত হয় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের নিয়ে। কারা কেবিনেট সদস্য হবেন তা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। লাস্কি বলেছেন— "Certain colleagues he must choose, because their presence in the government is expected by the party."

চতুর্থত, প্রত্যেক কেবিনেট মন্ত্রীর কেবিনেট সভায় উপস্থিত থাকার অধিকার রয়েছে এবং কেবিনেট সেক্রেটারিয়েট কর্তৃক জারিকৃত নথি ও কার্যবিবরণী পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু কেবিনেট-বহির্ভূত মন্ত্রীদের কেবল তাঁদের দপ্তরসংক্রান্ত বিষয় আলোচনার সময় সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়।

পঞ্চমত, আয়তনের দিক থেকে মন্ত্রিপরিষদ কেবিনেটের তুলনায় বৃহত্তর। সাধারণত কেবিনেটের সদস্যসংখ্যা ২০–২৫ জনের বেশি হয় না। হার্বার্ট মরিসন বলেছেন— শান্তিকালে ১৬–১৮ জনের কম সদস্য নিয়ে কেবিনেট কল্পনা করা যায় না। সাধারণত কেবিনেটের আয়তন মন্ত্রিপরিষদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। যুদ্ধকালীন সময়ে কেবিনেট আরও ক্ষুদ্রাকৃতির হতে পারে।

ষষ্ঠত, মন্ত্রিপরিষদের সকল সদস্য প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য নন; কিন্তু কেবিনেটের সকল সদস্য প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য হন।

সপ্তমত, মন্ত্রিপরিষদ একটি আইনগত সংস্থা। অন্যদিকে, কেবিনেটের সরাসরি কোনো আইনগত ভিত্তি নেই; এর ভিত্তি সাংবিধানিক রীতিনীতি ও প্রথা।

অষ্টমত, কেবিনেটের উত্থান-পতনের সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেবিনেট পদত্যাগ করলে মন্ত্রিপরিষদকেও পদত্যাগ করতে হয়।
খ. কার্যগত পার্থক্য

প্রথমত, সরকারি নীতিনির্ধারণের প্রকৃত ক্ষমতা কেবিনেটের হাতে। মন্ত্রিপরিষদের কাজ হলো কেবিনেট কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করা। এ কারণে ক্ষুদ্র সংস্থা হলেও কার্যগত দিক থেকে কেবিনেট অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, কেবিনেট সদস্যরা কমন্সসভার নিকট যৌথভাবে দায়িত্বশীল। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন হারালে তাদের একযোগে পদত্যাগ করতে হয়। কেবিনেটের ঐক্য ও গোপনীয়তা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের কেবিনেটের মতো যৌথ দায়িত্ব নেই; তাঁরা মূলত নিজ নিজ দপ্তরের জন্য ব্যক্তিগতভাবে দায়ী।

তৃতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণের জন্য কেবিনেটের নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হয়— সাধারণত সাপ্তাহিকভাবে এবং পার্লামেন্ট অধিবেশন চলাকালে প্রয়োজনে সপ্তাহে একাধিকবার। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদের সভার ক্ষেত্রে এমন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কেবিনেট সদস্যরা নিজ অধিকারে সভায় অংশগ্রহণ করেন; মন্ত্রিপরিষদের অন্য সদস্যদের আমন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কেবিনেট ও মন্ত্রিপরিষদ আপাতদৃষ্টিতে একই রকম মনে হলেও গঠন ও কার্যাবলির দিক থেকে উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। কেবিনেট মন্ত্রিপরিষদের একটি অংশ হলেও বাস্তবে কার্যকর ও নীতিনির্ধারণমূলক ক্ষমতা কেবিনেটের হাতেই কেন্দ্রীভূত। সময়ের সাথে সাথে উভয়ের পার্থক্য আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।

Post a Comment

أحدث أقدم