আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা আলোচনা কর


প্রশ্ন : আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা আলোচনা কর।

ভূমিকা : উদারনৈতিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ব্রিটেনের সংবিধানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো আইনের অনুশাসন (The Rule of Law)। যদিও আইনের অনুশাসন একটি প্রাচীন নীতি, তথাপি ব্রিটিশ সংবিধানেই এটি সর্বপ্রথম সাংবিধানিক মর্যাদা লাভ করে। ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতার প্রধান রক্ষাকবচ হলো আইনের অনুশাসন। আইনের অনুশাসন বলতে আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাধান্যকে বোঝায়। তাত্ত্বিকদের মতে— “In the eyes of the law, all persons, whether big or small, the highest capitalist or the poorest man, are equal in the event of violation of law.” এই কারণে ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনের অনুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা : A. V. Dicey-সহ অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আইনের অনুশাসনের যে ধারণা উপস্থাপন করেছেন, তা পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে। Jennings, Laski, Robson প্রমুখ চিন্তাবিদ বিভিন্ন দিক থেকে আইনের অনুশাসনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন। নিম্নে এ সীমাবদ্ধতাগুলো আলোচনা করা হলো—

১. আইনের অনুশাসনের সীমিত অর্থ : আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের আবির্ভাবের ফলে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা আর সম্পূর্ণভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের কার্যপরিধি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র প্রয়োজনে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে এবং তা সীমিত করতে পারে। ফলে আইনের অনুশাসনের প্রচলিত অর্থ ও তাৎপর্য সংকুচিত হয়েছে। ডাইসি ছিলেন মূলত একজন গোঁড়া ব্যক্তিস্বতন্ত্রী। কল্যাণরাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিকাশের ফলে সরকারের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে আইনের শাসনের পরিসর সীমিত হয়ে পড়েছে। অনেকের মতে, ডাইসির ব্যাখ্যা মূলত watchman state-এর জন্য প্রযোজ্য।

২. অর্পিত ক্ষমতার প্রভাব : অর্পিত ক্ষমতাবলে বিধি প্রণয়নের ব্যবস্থা আইনের শাসনের পরিপন্থী। আধুনিক রাষ্ট্রে পার্লামেন্ট সময় ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অভাবে প্রায়শই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শাসন বিভাগকে অর্পণ করে। এর ফলে শাসন বিভাগ আদেশ ও নির্দেশ জারির মাধ্যমে ব্যাপক স্বেচ্ছামূলক ক্ষমতা ভোগ করে, যা আইনের শাসনের মূল নীতির পরিপন্থী।

৩. পার্লামেন্ট ও মৌলিক অধিকার : ডাইসি মনে করতেন যে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তের ফল। কিন্তু বাস্তবে ব্রিটেনে মৌলিক অধিকার পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে পার্লামেন্ট চাইলে যে কোনো সময় এসব অধিকার সংকুচিত করতে পারে, যা আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।

৪. প্রশাসনের অশুভ প্রভাব : অনেক প্রশাসনিক আইন শাসন বিভাগকে ব্যাপক স্ববিবেচনামূলক ক্ষমতা প্রদান করেছে। এসব ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আদালতে জবাবদিহিতার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। ফলে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ আইনের অনুশাসনের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে না।

৫. সরকারের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা : ডাইসির মতে, সরকার কোনো স্বেচ্ছাধীন বা স্বৈরী ক্ষমতার ভিত্তিতে কাজ করতে পারে না। কিন্তু কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রবর্তনের ফলে রাষ্ট্রের কার্যাবলির জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর সঙ্গে সঙ্গে সরকারের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার পরিসরও বেড়েছে। এতে আইনের শাসনের কার্যকারিতা সীমিত হয়েছে।

৬. সার্বভৌম পার্লামেন্ট : ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রে আইনের চেয়ে পার্লামেন্টকেই সার্বভৌম হিসেবে গণ্য করা হয়। পার্লামেন্ট যে কোনো আইন প্রণয়ন, পরিবর্তন বা রহিত করতে পারে এবং কোনো আইনের শাসন পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জেনিংস মন্তব্য করেছেন— “No rule of law can restrain Parliament.” অতএব ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার মূলত পার্লামেন্টের ইচ্ছা ও প্রণীত আইনের ওপর নির্ভরশীল।

৭. সরকারি কর্মচারীদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা : ডাইসি আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেও বাস্তবে ব্রিটেনে সাধারণ নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য লক্ষ করা যায়। সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় অধিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন, যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

৮. প্রশাসনিক বিচারব্যবস্থা : ব্রিটেনে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রে বিচারসংক্রান্ত কার্য সম্পাদন করে থাকেন, যা আইনের শাসনের মূল ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। উদাহরণস্বরূপ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশিদের নাগরিকতা প্রদানের সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব সিদ্ধান্ত আদালতে আপিলযোগ্য নয়।

মূল্যায়ন : আইনের অনুশাসন সম্পর্কিত ডাইসির ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমালোচনাগুলো বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে ডাইসির ধারণা পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্পিত ক্ষমতাপ্রসূত আইন এবং শাসন বিভাগের ক্ষমতার বিস্তারের ফলে বিভিন্ন দেশে আইনের অনুশাসনের অর্থ সংকুচিত হয়েছে।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, A. V. Dicey প্রদত্ত আইনের অনুশাসনের ব্যাখ্যা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবুও আইনের অনুশাসন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার রক্ষায় একটি শক্তিশালী নীতি হিসেবে কাজ করেছে। জনগণের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় এই নীতি ব্যাপকভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সুতরাং নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন পরস্পর ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত।

Post a Comment

أحدث أقدم