প্রশ্ন : ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের উৎসসমূহ আলোচনা কর।
ভূমিকা : আধুনিক বিশ্বের প্রাচীনতম সংবিধান হলো ব্রিটিশ সংবিধান। এটি “The Mother of all Constitutions” নামে পরিচিত। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংবিধান এই সংবিধানকে অনুসরণ করে প্রভাবিত হয়েছে। ব্রিটিশ সংবিধান কোনও নির্দিষ্ট গণপরিষদ, বিপ্লবী সভা বা রাজাদেশের মাধ্যমে তৈরি হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ, ধীর, অব্যাহত এবং মূলত শান্তিপূর্ণ ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। এ কারণে ব্রিটিশ সংবিধান একক উৎসের নয়, বরং বহু উৎসের সমন্বয়ে গঠিত। ফলে এই সংবিধান কখনই সম্পূর্ণ নয়; সবসময়ের জন্যই ক্রমবর্ধমান। এই বৈচিত্র্যের কারণে বলা হয়, জীবনভর পড়লেও এ সংবিধান সম্পর্কে পুরো ধারণা পাওয়া কঠিন।
ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস : ব্রিটিশ সংবিধান মূলত অলিখিত হলেও, এটি নির্দিষ্ট কয়েকটি উৎসের উপর প্রতিষ্ঠিত। ব্রিটিশ সংবিধানের উৎসসমূহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
ক. শাসনতান্ত্রিক আইন (Statutory or Constitutional Law) : ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের সেই অংশ যা আদালত আইন হিসেবে স্বীকার করে এবং বলবৎ করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—
১. ঐতিহাসিক সনদ ও চুক্তিপত্র : বিভিন্ন সময়ে ইংল্যান্ডের রাজা কর্তৃক স্বীকৃত ও গৃহীত সনদ, সন্ধি ও চুক্তিপত্র। উদাহরণ:
১২১৫ সালের মহাসনদ (Magna Carta)
১৬২৮ সালের অধিকার আবেদনপত্র (Petition of Right)
১৬৮৯ সালের অধিকার বিল (Bill of Rights)
২. বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত : ডাইসি অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের সাধারণ সূত্রগুলি আদালতের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। বিচারকগণ মামলার রায়ের মাধ্যমে নতুন শাসনতান্ত্রিক আইন তৈরি করেন।
৩. পার্লামেন্ট সংক্রান্ত আইন : পার্লামেন্টের প্রণীত আইন ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম উৎস। উদাহরণ:
১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস আইন
১৭০১ সালের উত্তরাধিকার আইন
১৮৩২, ১৮৬৭ ও ১৮৮৪ সালের সংস্কার আইন
১৯১১ ও ১৯৪৯ সালের পার্লামেন্ট আইন
১৯৩৮ সালের জন প্রতিনিধিত্ব আইন
৪. প্রথাগত আইন : শতাব্দীব্যাপী প্রথা ও রীতিনীতি, যা আদালতের মাধ্যমে আইনের স্বীকৃতি পেয়েছে। উদাহরণ:
রাজার বিশেষাধিকার
জুরির সাহায্যে বিচারের অধিকার
বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
সমাবেশের স্বাধীনতা
৫. বিধিবদ্ধ আইন : পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত বিশেষ আইনসমূহ, যা শাসনতন্ত্রের উৎস হিসেবে বিবেচিত। উদাহরণ: ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস আইন, ১৭০১ সালের সেটলমেন্ট আইন।
৬. শাসনতন্ত্র সংক্রান্ত গ্রন্থ : আইনবিদ ও পণ্ডিতদের রচিত প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ সংবিধানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
৭. কমন আইন : অলিখিত রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা কমন আইনও ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস। এটি পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেও সর্বত্র গ্রহণযোগ্য।
খ. শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি (Conventions) : ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু আইনগত কাঠামো দিয়ে শাসনব্যবস্থার যথার্থ রূপ প্রকাশ পায় না; শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি আইন ও শাসনব্যবস্থাকে কার্যকর করে। জে.এস. মিল অনুযায়ী, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি হলো শাসনতন্ত্রের অলিখিত বিধি। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত—
রাজার সঙ্গে মন্ত্রিসভার সম্পর্ক
মন্ত্রিসভার সঙ্গে পার্লামেন্টের সম্পর্ক
পার্লামেন্ট অধিবেশন
পার্লামেন্টের অভ্যন্তরীণ কার্যপদ্ধতি
জনগণের অধিকার ইত্যাদি
উপসংহার : ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস বহু। কোন একক দলিল বা আইনের মাধ্যমে সব উৎসের সন্ধান পাওয়া যায় না। সংবিধান হল ধীর, অব্যাহত, কখনও দৈব, কখনও পরিকল্পিত পরিবর্তনের ফল। ঐতিহাসিক সনদ, পার্লামেন্ট প্রণীত আইন, বিচার বিভাগীয় সিদ্ধান্ত, প্রথাগত আইন, শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং প্রখ্যাত আইন বিশারদের রচনাবলী—এই সকলই ব্রিটিশ সংবিধানের উৎস।

إرسال تعليق