ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব সম্পর্কে মতপার্থক্য আলোচনা কর


প্রশ্ন: 
ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব সম্পর্কে মতপার্থক্য আলোচনা কর।

ভূমিকা: পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শাসনতন্ত্রের উৎপত্তির ইতিহাস এবং ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার উৎপত্তির ইতিহাস এক নয়। ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থা কোনো সুপরিকল্পিত পরিকল্পনার ফল নয়, আবার এটি দেশবাসীর ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়াও হয়নি। বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক ও ওতপ্রোত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তবে এই শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপাদান সংবিধানটি মূলত অলিখিত হওয়ায় অনেকেই এর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার অনেকে ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব স্বীকার করে এর প্রশংসাও করেছেন। ফলে ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে টকভিল, বার্ক, পেইন, জেনিংস, মুনরো প্রমুখের মতামত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব সম্পর্কে মতপার্থক্য:
ব্রিটেনের সংবিধান অসংবদ্ধ ও অবিধিবদ্ধ হওয়ায় এর প্রকৃতি ও অস্তিত্ব নিয়ে আইনবিশারদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, ব্রিটিশ সংবিধানের প্রকৃতপক্ষে কোনো অস্তিত্ব নেই। এদের মধ্যে ফরাসি লেখক টকভিল, টমাস পেইন ও বার্নার্ড শ-এর নাম উল্লেখযোগ্য। টকভিলের মতে— “In England, the Constitution does not exist.”

অন্যদিকে আইভর জেনিংস, মুনরো ও এডমন্ড বার্ক প্রমুখ সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন এবং এর প্রশংসা করেছেন। তাছাড়া ইংরেজ জাতির নিজেরাও তাদের সংবিধানের অস্তিত্ব নিয়ে কখনো সংশয়ে ভোগ করেনি; বরং তারা গর্বের সঙ্গে একে পৃথিবীর প্রাচীনতম সংবিধান হিসেবে বিবেচনা করে।

মতপার্থক্যের কারণ:
অধ্যাপক কে. সি. হুইয়ারের ভাষায়— “The word ‘Constitution’ is commonly used in at least two senses in any ordinary discussion of political affairs.”

অর্থাৎ ‘সংবিধান’ শব্দটি সাধারণত দুইটি অর্থে ব্যবহৃত হয়—
১. সংকীর্ণ অর্থে সংবিধান এবং
২. ব্যাপক অর্থে সংবিধান।

সংকীর্ণ অর্থে সংবিধান বলতে একটি নির্দিষ্ট দলিলে লিপিবদ্ধ দেশের শাসনসংক্রান্ত মৌলিক আইনসমূহকে বোঝায়। এই অর্থে বিচার করলে বলা যায় যে, ব্রিটেনের কোনো সংবিধান নেই। অপরদিকে ব্যাপক অর্থে সংবিধান বলতে সেই সব লিখিত ও অলিখিত নিয়মকানুনের সমষ্টিকে বোঝায়, যার মাধ্যমে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব স্পষ্টভাবে স্বীকৃত। মূলত সংবিধান শব্দের এই অর্থগত পার্থক্যের কারণেই একদল চিন্তাবিদ ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব স্বীকার করেন, আর অন্যদল তা অস্বীকার করেন। এ থেকেই প্রশ্নটির উদ্ভব—“ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব আছে কি নেই?”

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ সংবিধানের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সংবিধান লিখিত, অলিখিত অথবা আংশিক লিখিত-আংশিক অলিখিত হতে পারে। যেমন—মার্কিন সংবিধান লিখিত হলেও মাত্র কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে সে দেশের শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পাওয়া যায় না। তেমনি ব্রিটিশ সংবিধান অলিখিত হলেও এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। অতএব বলা যায়, ব্রিটিশ সংবিধান সম্পর্কে টকভিলের মন্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন