লর্ডসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর


প্রশ্ন: লর্ডসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর।

ভূমিকা : বিশ্বের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন দ্বিতীয় কক্ষ হলো ব্রিটেনের লর্ডসভা। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে এর প্রকৃতিগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। পূর্বে লর্ডসভার যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল। অধিকাংশ বিষয়ে এটি কমন্সসভার সমান ক্ষমতা ভোগ করত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর ক্ষমতা কমন্সসভার চেয়েও বেশি ছিল। তবে বর্তমানে লর্ডসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

লর্ডসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি : অতীতে লর্ডসভা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকলেও বর্তমানে এর ক্ষমতা ও কার্যাবলি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে এর ক্ষমতা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। ফাইনার (Finer) যথার্থই বলেছেন, “The House of Lords has become a revising and delaying chamber only.” নিম্নে বর্তমানে লর্ডসভা যেসব ক্ষমতা ভোগ করে ও কার্যাবলি সম্পাদন করে, তা আলোচনা করা হলো—

১. শাসনসংক্রান্ত ক্ষমতা : লর্ডসভা শাসনসংক্রান্ত ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। এর বিভিন্ন কমিটি স্থানীয় বা বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনা করে। বিধিবদ্ধ আইন অনুযায়ী জারি করা বিভিন্ন নির্দেশনা ও প্রণীত নিয়মকানুন লর্ডসভা অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

২. বিল উত্থাপন : বেসরকারি বিলের ক্ষেত্রে লর্ডসভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হলেও লর্ডসভার সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে এ কাজ সম্পাদন করেন। ফলে কমন্সসভার সদস্যরা সময় অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা পান।

৩. বিল সংশোধন : লর্ডসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো বিল সংশোধন করা। এর অনেক সদস্য খ্যাতনামা আইনবিদ ও বিভিন্ন পেশার অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তাই কমন্সসভায় পাসকৃত বিল লর্ডসভায় প্রেরিত হলে সদস্যরা তা সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করেন। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বিলসমূহের উন্নয়নের লক্ষ্যে লর্ডসভা সংশোধনী প্রস্তাব করতে পারে।

৪. আইন প্রণয়ন : লর্ডসভা কেবল বিল উত্থাপন ও সংশোধনই করে না, প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ আইনও প্রণয়ন করে থাকে। বর্তমানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে ক্রমবর্ধমান হারে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এককভাবে কমন্সসভার পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। তাই লর্ডসভাকেও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হয়। অর্থবিল ব্যতীত যে কোনো বিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টের যে কোনো কক্ষে উত্থাপন করা যায়।

৫. আইন প্রণয়নে বিলম্ব ঘটানো : কমন্সসভায় গৃহীত বিলের বিধিবদ্ধকরণে বিলম্ব ঘটানোর ক্ষমতা লর্ডসভার রয়েছে। সাধারণত লর্ডসভা কোনো বিলের কার্যকারিতা এক বছর পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পারে। যখন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকে, তখন এ ক্ষমতা অধিক কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়।

৬. বিচারসংক্রান্ত ক্ষমতা : লর্ডসভা বিচার বিভাগীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে কাজ করে। দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় ধরনের মামলায় লর্ডসভা সর্বোচ্চ আপিল কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এছাড়া পিয়ার পদ লাভসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে এবং নিজস্ব বিশেষ অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে কাউকে অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড প্রদান করতে পারে।

৭. সমসাময়িক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা : লর্ডসভা দেশরক্ষা, বৈদেশিক নীতি, কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে পারে। সদস্যদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ না থাকায় তারা সরকারি নীতির সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে গভীর ও তথ্যবহুল বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। এসব বিতর্ক সরকারের নীতিনির্ধারণে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করে।

৮. অন্যান্য কার্যাবলি : উপর্যুক্ত ক্ষমতা ও কার্যাবলি ছাড়াও লর্ডসভা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করে। যেমন— স্থানীয় বা বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিল এবং অর্পিত ক্ষমতাপ্রসূত আইন বিচার-বিবেচনার কাজে অংশগ্রহণ করে। এছাড়া লর্ডসভা থেকে ক্যাবিনেটের সদস্যও মনোনীত হতে পারেন।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় লর্ডসভার অস্তিত্ব অপরিহার্য। যদিও বর্তমানে এর ভূমিকা পূর্বের তুলনায় সীমিত, তথাপি এর গুরুত্ব কম নয়। ফাইনারের মতে, গুরুত্বপূর্ণ আইনসংক্রান্ত ক্ষমতা একসময় লর্ডসভার ওপর ন্যস্ত ছিল এবং এখনো তার কিছু অবশিষ্ট রয়েছে। সুতরাং ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় লর্ডসভা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিদ্যমান।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন