প্রশ্ন : কমন্সসভা কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে আলোচনা কর।
ভূমিকা : ব্রিটেনে মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। এ ধরনের সরকারব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্টের অবস্থান এমন যে, পার্লামেন্ট মন্ত্রিসভাকে নিয়ন্ত্রণ করে; অপরদিকে মন্ত্রিসভাও পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রিটেনের সংসদীয় বা মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো কমন্সসভার নিকট মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্বশীলতা।
কমন্সসভা কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে : সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কমন্সসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্রিটিশ কমন্সসভা কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে তা নিম্নে আলোচনা করা হলো—
১. সরকার গঠনের মাধ্যমে : মন্ত্রিসভার গঠন কমন্সসভার ওপর নির্ভরশীল। কমন্সসভায় যে দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, সে দলই সরকার গঠন করে। প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা কমন্সসভার সদস্য হন। কমন্সসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সহায়ক। দলে যদি বিরাট ভাঙন দেখা দেয়, তাহলে মন্ত্রিসভা হয় পদত্যাগ করে, না হয় নতুন নির্বাচনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মন্ত্রিসভার ওপর কমন্সসভার এটি একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
২. মন্ত্রিপরিষদের কার্যকাল নিয়ন্ত্রণ : মন্ত্রিপরিষদের স্বাভাবিক কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর। এ মেয়াদ পর্যন্ত সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারবে কি না তা কমন্সসভার আস্থার ওপর নির্ভরশীল। কমন্সসভায় যতক্ষণ সরকারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় থাকে, ততক্ষণই মন্ত্রিপরিষদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব। দলীয় বিরোধ বা অন্য কোনো কারণে কমন্সসভায় শাসক দল সংখ্যালঘুতে পরিণত হলে মন্ত্রিপরিষদের পদত্যাগ করতে হয়।
৩. মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ : কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার জন্য যথাযথ নোটিশ প্রদানের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর জবাবে প্রশ্নকারী সন্তুষ্ট না হলে কমন্সসভা উক্ত বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন করতে পারে। এভাবে মুলতবি প্রস্তাবের মাধ্যমে কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
৪. প্রশ্ন জিজ্ঞাসার মাধ্যমে : কমন্সসভার যে কোনো সদস্য শাসনসংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রীদের প্রশ্ন করতে পারেন। সাধারণত বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলকে অসুবিধায় ফেলার জন্য এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কমন্সসভায় উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দেন। প্রশ্নোত্তরকালে কোনো মন্ত্রী মিথ্যার আশ্রয় নিলে তা প্রকাশ পেয়ে যায়। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও দলের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন হয়। প্রশ্ন জিজ্ঞাসার জন্য অন্ততপক্ষে দুই দিন আগে নোটিশ প্রদান করতে হয়। কাজেই এজন্য মন্ত্রিগণ তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হন।
৫. নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপন : সরকারের কোনো বিশেষ নীতি বা কার্যকলাপের জন্য কমন্সসভা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক প্রস্তাব করতে পারে। তাছাড়া বিরোধী দলের সদস্যগণ কতকগুলো জরুরি বিষয়ে বিতর্কের জন্য সভার সময় বরাদ্দের জন্য সরকারের নিকট আহ্বান জানাতে পারেন। সরকার সময়ের স্বল্পতার কারণে নিজস্ব বিল পাসে ব্যস্ত থাকায় বিরোধী দলের প্রস্তাবে সাড়া দিতে চায় না। এরূপ পরিস্থিতিতে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব বা নিন্দাসূচক প্রস্তাব আনতে পারে। এর মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণে সমর্থ হয়।
৬. সিলেক্ট কমিটি গঠন : সিলেক্ট কমিটির মাধ্যমে সরকারি কাজকর্ম ও নীতি সম্পর্কে তদন্ত কার্য পরিচালনা করা যায়। সুতরাং সিলেক্ট কমিটি গঠনের মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।
৭. অনাস্থা প্রস্তাব : বিরোধী দলভুক্ত সদস্যরা সরকারকে অসুবিধায় ফেলার জন্য এবং নিজ দলের সপক্ষে জনমত গঠনের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কোনো একজন বিশেষ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিংবা সমগ্র সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা যেতে পারে। এরূপ প্রস্তাব গৃহীত হলে মন্ত্রিপরিষদকে পদত্যাগ করতে হয়। কাজেই মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হলো কমন্সসভায় অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন।
৮. সরকারের নীতি নিয়ন্ত্রণ : সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি কার্যকর করার জন্য কমন্সসভার অনুমোদন প্রয়োজন হয়। কমন্সসভা কর্তৃক উক্ত বিল ও প্রস্তাব গৃহীত না হলে সরকারের পক্ষে দায়িত্ব পালন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে মন্ত্রিসভার কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রে কমন্সসভা প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
৯. জনমত গঠন : কমন্সসভা জনমত গঠনের মাধ্যমেও মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কমন্সসভা সরকারি নীতি ও কাজকর্মের ওপর সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কাজ ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। সুতরাং জনমত গঠনের মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
১০. কমিশনার গঠন : পার্লামেন্টারি কমিশনারের মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ১৯৬৬ সালে প্রণীত পার্লামেন্টারি কমিশনার আইনের অধীনে কমন্সসভায় পার্লামেন্টারি কমিশনার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পার্লামেন্টের সদস্যগণ তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে শাসন বিভাগের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনেন, সে সম্পর্কে অনুসন্ধান করা পার্লামেন্টারি কমিশনারের প্রধান কাজ।
উপসংহার : আলোচনার শেষে বলা যায় যে, উপর্যুক্ত পন্থার মাধ্যমে ব্রিটেনের আইনসভার নিম্নকক্ষ কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে সুসংহত দলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা, নির্বাচনী এলাকার বিস্তৃতি প্রভৃতি কারণে কমন্সসভা মন্ত্রিসভাকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ প্রসঙ্গে বার্চ বলেছেন, “পার্লামেন্টের নিকট মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব তাত্ত্বিকভাবে অসীম হলেও ইংল্যান্ডে সুশৃঙ্খল ও সুসংহত দলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার ফলে সে গুরুত্ব বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে।”

إرسال تعليق