প্রশ্ন: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আলোচনা কর।
ভূমিকা : পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বকে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভরূপে গণ্য করা হয়। প্রাচীনত্ব, ক্ষমতার পরিধি, প্রয়োগক্ষেত্রের ব্যাপ্তি প্রভৃতি দিক থেকে বিচার করলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পৃথিবীতে অনন্য। ব্রিটেনের সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উপর পার্লামেন্টের নিরঙ্কুশ আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত। আইনে পার্লামেন্টের ক্ষমতার কোনো সীমা টানা হয়নি। ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পার্লামেন্টের এ আইনগত প্রাধান্য একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এজন্য K. C. Wheare মন্তব্য করেছেন, "The supremacy of Parliament is the cornerstone of the British Constitution."
পার্লামেন্টের সীমাবদ্ধতা : আইনগত দিক থেকে পার্লামেন্টের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে এর ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিভিন্নভাবে সীমাবদ্ধ। যথা :
১. জনমতের নিয়ন্ত্রণ : তত্ত্বগতভাবে পার্লামেন্ট যেকোনো আইন প্রণয়ন করতে পারলেও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে জনসাধারণের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে অগ্রাহ্য করে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না।
২. প্রথা ও রীতিনীতির গুরুত্ব : ব্রিটেনের শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো সুদীর্ঘকালের সংগ্রাম ও দীর্ঘকালীন শাসনতান্ত্রিক ক্রমবিবর্তনের ফল। এগুলোর প্রতি জনগণের আনুগত্য অপরিসীম। তাই পার্লামেন্ট এগুলোকে উপেক্ষা করে আইন তৈরি করতে পারে না।
৩. ক্যাবিনেট প্রথা : বর্তমানে ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় ক্যাবিনেট পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে, পার্লামেন্ট ক্যাবিনেটকে নয়। ব্রিটেনে সুসংগঠিত দলীয় ব্যবস্থার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে ক্যাবিনেটের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাস্তবে পার্লামেন্টের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
৪. আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ন্ত্রণ : বর্তমানে বিশ্বের সকল সভ্য রাষ্ট্রই আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। ব্রিটেনও এর ব্যতিক্রম নয়। তাই আন্তর্জাতিক আইনের গণ্ডির মধ্য থেকেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে কাজ করতে হয়।
৫. ওয়েস্টমিনস্টার আইন : ১৯৩১ সালে ওয়েস্টমিনস্টার আইন প্রণীত হওয়ার ফলে কোনো ডোমিনিয়নের মতামত ছাড়া পার্লামেন্ট সেই ডোমিনিয়নের জন্য কোনো আইন তৈরি করতে পারে না।
৬. রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নিয়ন্ত্রণ : ব্রিটেনের জনসাধারণই রাজনৈতিক সার্বভৌম। সুতরাং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পার্লামেন্ট কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারে না। লর্ড সেসিল মন্তব্য করেছেন, "The real principle of our Constitution now is popular plebiscite."
৭. আদালতের আংশিক নিয়ন্ত্রণ : মার্কিন আদালতের মতো ব্রিটিশ আদালত আইনসভা কর্তৃক প্রণীত আইনের বৈধতা বিচার করতে পারে না, তবে আইন ব্যাখ্যা করতে পারে। আদালত আইন ব্যাখ্যার মাধ্যমে পার্লামেন্টের উপর আংশিকভাবে হলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আইনগত দিক থেকে সার্বভৌম হলেও তা অনেকাংশে তত্ত্বসর্বস্ব। ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্যাবিনেটই বর্তমানে ক্ষমতার মূলকেন্দ্র হিসেবে বিরাজ করছে। তত্ত্বগতভাবে পার্লামেন্ট খেয়ালখুশিমতো আচরণ করতে পারে না। বিভিন্ন কারণে পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বের উপর সীমাবদ্ধতা আরোপিত হয়ে থাকে। সুতরাং সমগ্র বিষয়টি ব্রিটেনের আর্থ-সামাজিক বিন্যাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন