কমন্সসভার স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর


প্রশ্ন: কমন্সসভার স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর।

ভূমিকা : কমন্সসভার সভাপতি হলেন স্পিকার। সে কারণে কমন্সসভার অধিবেশনে সভাপতিত্ব করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কমন্সসভার সভাপতি হিসেবে স্পিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

কমন্সসভার স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি: নিম্নে কমন্সসভার স্পিকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা করা হলো—

১. সভার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা :
কমন্সসভার সভাপতি হিসেবে স্পিকারের প্রধান দায়িত্ব হলো সভার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা। সভার বিতর্ক চলাকালে কেউ যাতে অশালীন মন্তব্য বা আপত্তিকর আচরণের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, সেদিকে তিনি লক্ষ্য রাখেন। সদস্যদের সতর্ক করা, সভাকক্ষ ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া এবং প্রয়োজনে শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা স্পিকারের রয়েছে।

২. সভার কার্যপরিচালনা :
স্পিকার সভার কার্যপরিচালনা করেন। অর্থাৎ সভার প্রতিদিনের আলোচ্যসূচি নির্ধারণ, বিভিন্ন বিষয়ে কত সময় আলোচনা হবে এবং কার জন্য কতটুকু সময় বরাদ্দ থাকবে, তা তিনি নির্ধারণ করেন। এ বিষয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। তিনি কমন্সসভার কোনো বিতর্কে অংশ নেন না বা সাধারণভাবে ভোট প্রদান করেন না। তবে ভোটগ্রহণের নির্দেশ দেন এবং ফলাফল ঘোষণা করেন। পক্ষে ও বিপক্ষে ভোট সমান হলে তিনি নির্ণায়ক (Casting) ভোট প্রদান করেন। এক্ষেত্রে তিনি এমনভাবে ভোট দেন, যাতে বিষয়টির চূড়ান্ত মীমাংসা না হয়ে কমন্সসভার পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকে।

৩. কমিটিগুলোর সভাপতি নিয়োগ :
কমন্সসভার পাঁচটি স্থায়ী কমিটি রয়েছে, যেগুলো আইনের খুঁটিনাটি বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে সভায় প্রতিবেদন প্রদান করে। স্পিকার এসব স্থায়ী কমিটির সভাপতি নিয়োগ করেন। এছাড়া তাঁর এবং তাঁর সহকারী স্পিকারের অনুপস্থিতিতে কমন্সসভার কার্য পরিচালনার জন্য সভাপতিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেন।

৪. সভার নিয়মকানুন ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ :
স্পিকার কমন্সসভার কার্যপদ্ধতি-সংক্রান্ত নিয়মকানুনের যথাযথ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করেন। এক্ষেত্রে তিনি প্রচলিত নিয়ম এবং অতীতের নজির অনুসরণ করেন। কমন্সসভার কোনো বিষয়ে আলোচনা বন্ধ করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে তিনি নিজ বিবেচনায় তার নিষ্পত্তি করেন। এছাড়া কোনো প্রস্তাব উত্থাপন-সংক্রান্ত প্রযোজ্য আইন ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।

৫. কমন্সসভার মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা :
কমন্সসভার মুখপাত্র হিসেবে স্পিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কমন্সসভার হুকুমনামা (Writ) জারি করেন। কোনো আসন শূন্য হলে তা পূরণের জন্য নির্দেশনামা জারি করেন। এছাড়া তাঁকে সহায়তা করার জন্য একটি দপ্তর রয়েছে। দপ্তরের কর্মচারীরা স্পিকারের অধীনে থেকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেন।

৬. কমন্সসভার সদস্যদের অধিকার রক্ষা :
কমন্সসভার সদস্যদের অধিকার রক্ষায় স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সভায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তিনি পিছনের সারির সদস্য, বিরোধী দল এবং সংখ্যালঘু সদস্যদের অধিকার সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। প্রয়োজনে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটকের নির্দেশ দিতে পারেন; তবে অধিবেশন শেষে তাকে মুক্তি দিতে হয়।

৭. কমন্সসভা ও রাজশক্তির মধ্যে যোগসূত্র :
স্পিকার কমন্সসভা ও রাজশক্তির মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন। তিনি কমন্সসভার পক্ষ থেকে রাজা বা রানীর নিকট বিভিন্ন আবেদন উপস্থাপন করেন এবং পার্লামেন্টের নতুন অধিবেশনের সূচনাকালে কমন্সসভার প্রচলিত অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি রাজা বা রানীর নিকট তুলে ধরেন। এ কারণে স্পিকারকে কমন্সসভা ও রাজশক্তির মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

৮. অর্থবিল সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত :
অর্থবিল সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কমন্সসভার স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কমন্সসভায় উত্থাপিত কোনো বিল অর্থবিল কি না, তা তিনি নির্ধারণ করেন। লর্ডসভা এবং রাজা বা রানীর নিকট অর্থবিল প্রেরণের সময় স্পিকার প্রত্যয়ন করেন যে বিলটি একটি অর্থবিল।

৯. নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূমিকা :
বিরোধী দলের নেতা নির্বাচন ব্রিটিশ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিরোধী দলকে সেখানে ‘ছায়া সরকার’ (Shadow Government) হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই বিরোধী দলের নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো সন্দেহ বা বিতর্ক সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে স্পিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, ব্রিটিশ কমন্সসভার স্পিকারের পদটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও ক্ষমতাসম্পন্ন। স্পিকারের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাই তাঁর মর্যাদাকে আরও বৃদ্ধি করেছে। ফলে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বহুবিধ দায়িত্ব পালন করেন। কমন্সসভার ঐতিহ্য পর্যালোচনা করে আইভার জেনিংস (Jennings) মন্তব্য করেছেন, “স্পিকারের মতো অন্য কোনো ব্যক্তি এত বিশ্বস্তভাবে ব্রিটিশ সংবিধানের মর্মবস্তু তুলে ধরতে সক্ষম হননি।” অন্যদিকে, হেনিংস (Hennings) বলেন, “স্পিকারের পদমর্যাদার মতো অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এত স্পষ্টভাবে ব্রিটিশ সংবিধানের মহত্ত্ব এবং ইংরেজ জাতির যুক্তিবাদী মানসিকতার পরিচয় বহন করে না।”

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন