ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারি বিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা কর


প্রশ্নঃ ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারি বিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা কর।

ভূমিকা : আইন প্রণয়ন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারি নীতি ও কার্যাবলির সামঞ্জস্য বিধান এবং পুরোনো আইন সংশোধন ও নতুন আইন প্রণয়ন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অন্যতম প্রধান কাজ। আইনের খসড়াকে বিল (Bill) বলা হয়। পার্লামেন্টে বিল পাস হয়ে রাজা বা রানীর সম্মতি লাভের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সংবিধান মূলত সাংবিধানিক রীতি-নীতি ও প্রথাভিত্তিক হলেও বিভিন্ন সময়ে প্রণীত আইনের মাধ্যমে বিল পাসের পদ্ধতি নির্ধারিত হয়েছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিল পাসের পদ্ধতি: বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে বিল বিভিন্ন প্রকার হওয়ায় বিল পাসের পদ্ধতিতেও কিছু পার্থক্য দেখা যায়। নিম্নে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারি বিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।

ক. সাধারণ স্বার্থ-সংক্রান্ত বিল পাসের পদ্ধতি: জাতীয় বা সাধারণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিলকে সাধারণ স্বার্থ-সংক্রান্ত বিল (Public Bill) বলা হয়। পার্লামেন্টের যেকোনো কক্ষে এ ধরনের বিল উত্থাপন করা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকারি মন্ত্রীরাই কমন্সসভায় এ বিল উত্থাপন করেন। অধ্যাপক মুনরো বলেছেন— "A public bill is one which affects the general interest and ostensibly concerns the whole people or, at any rate, a large portion of them." — Prof. W. B. Munro, The Governments of Europe, p. 182

সাধারণ স্বার্থ-সংক্রান্ত বিল তিন প্রকার। যথা—

১. সরকারি বিল (Government Bill)
২. বেসরকারি সদস্যের বিল (Private Member's Bill)
৩. অর্থবিল (Money Bill)

নিম্নে সরকারি বিল পাসের পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।

১. সরকারি বিল: সরকারি বিল সাধারণত সরকারি মন্ত্রী কর্তৃক উত্থাপিত হয়। বিল উত্থাপনের পূর্বে এর খসড়া প্রস্তুত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনের পর তা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হয়। প্রতিটি সরকারি বিলের সঙ্গে একটি ব্যাখ্যামূলক স্মারক (Memorandum) সংযুক্ত থাকে।

সরকারি বিল নিম্নোক্ত পর্যায় অতিক্রম করে আইনে পরিণত হয়—

প্রথম পর্যায় : বিল উত্থাপন (First Reading): সরকারি বিল উত্থাপনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বিল উত্থাপনের নোটিশ দিতে হয়। নির্ধারিত দিনে স্পিকার মন্ত্রীকে বিল উত্থাপনের আহ্বান জানান। এরপর মন্ত্রী কক্ষের করণিকের নিকট বিলের 'ডামি' কপি পেশ করেন। করণিক বিলটির শিরোনাম পাঠ করেন। এর মাধ্যমে প্রথম পাঠ সম্পন্ন হয় এবং দ্বিতীয় পাঠের দিন নির্ধারণ করা হয়।

দ্বিতীয় পর্যায় : বিলের দ্বিতীয় পাঠ (Second Reading):  এটি বিল পাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এ পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বিলের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান করেন। এরপর সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বিলের নীতি ও উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়। এ সময় বিল স্থগিত রাখা, প্রত্যাখ্যান করা অথবা সংশোধনের প্রস্তাব উত্থাপিত হতে পারে। প্রস্তাবগুলো নিষ্পত্তির পর বিলটি কমিটি পর্যায়ে পাঠানো হয়।

তৃতীয় পর্যায় : কমিটি পর্যায় (Committee Stage): এ পর্যায়ে বিলটি সমগ্র কক্ষের কমিটি (Committee of the Whole House) অথবা কোনো সিলেক্ট বা স্থায়ী কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়। কমিটি বিলের প্রতিটি ধারা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করে এবং প্রয়োজনবোধে সংশোধনের সুপারিশ করে। তবে বিলের মৌলিক নীতি পরিবর্তনের ক্ষমতা কমিটির নেই।

চতুর্থ পর্যায় : প্রতিবেদন স্তর (Report Stage): কমিটি বিল পরীক্ষা শেষে তার প্রতিবেদন কমন্সসভায় উপস্থাপন করে। এ পর্যায়ে বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা ও ভোটাভুটি হয়। কমিটির প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোও বিবেচনা করা হয়। তবে কমন্সসভা কমিটির সুপারিশ গ্রহণে বাধ্য নয়।

পঞ্চম পর্যায় : তৃতীয় পাঠ (Third Reading): এ পর্যায়ে সমগ্র বিল নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয় এবং বিলটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের জন্য ভোট গ্রহণ করা হয়। কমন্সসভায় বিলটি গৃহীত হলে তা লর্ডসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।

ষষ্ঠ পর্যায় : লর্ডসভার অনুমোদন: কমন্সসভায় গৃহীত বিলটি লর্ডসভায় প্রেরণ করা হয়। লর্ডসভা বিলটি অনুমোদন করতে পারে অথবা সংশোধনের সুপারিশ করতে পারে। সংশোধনের প্রস্তাব থাকলে তা পুনরায় কমন্সসভায় পাঠানো হয়। উভয় কক্ষের মধ্যে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিলটি আদান-প্রদান চলতে থাকে। উভয় কক্ষের সম্মতিতে বিলটি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়।

সপ্তম পর্যায় : রাজকীয় সম্মতি (Royal Assent): পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে বিলটি গৃহীত হওয়ার পর রাজা বা রানীর সম্মতির জন্য পাঠানো হয়। বর্তমানে রাজকীয় সম্মতি একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। কারণ রাজা বা রানী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী বিলে সম্মতি প্রদান করেন। রাজকীয় সম্মতি লাভের পরই বিলটি আইনে পরিণত হয়।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায় যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে সরকারি বিল পাসের প্রক্রিয়া অত্যন্ত সুসংগঠিত, পর্যায়ক্রমিক এবং গণতান্ত্রিক। বিলটি একাধিক স্তরে পরীক্ষা, বিতর্ক ও সংশোধনের সুযোগ পায় বলে আইন প্রণয়নে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়। কমন্সসভা, লর্ডসভা এবং সর্বশেষে রাজকীয় সম্মতির মাধ্যমে সরকারি বিল আইনে পরিণত হয়। ফলে ব্রিটিশ আইন প্রণয়ন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম সুপরিকল্পিত ও কার্যকর সংসদীয় প্রক্রিয়া হিসেবে স্বীকৃত।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন