ভূমিকা: ব্রিটেনের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় স্পিকারের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৩৭৭ সালে ব্রিটেনে স্পিকারের পদ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং স্যার টমাস হাঙ্গারফোর্ড (Sir Thomas Hungerford) ব্রিটেনের প্রথম স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ সাংবিধানিক ইতিহাসে স্পিকারের পদ এতটাই ঐতিহ্যবাহী ও মর্যাদাপূর্ণ যে, বিশ্বের বহু দেশে এ পদের অনুসরণে অনুরূপ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে ব্রিটেনের স্পিকার পদ বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের মাধ্যমে।
কমন্সসভার স্পিকার নির্বাচনের পদ্ধতি: প্রতিটি সাধারণ নির্বাচনের পর নবগঠিত কমন্সসভার প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার নির্বাচন করেন।
এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে পরামর্শ করে এমন একজন সদস্যের নাম প্রস্তাব করেন, যিনি সরকারি ও বিরোধী—উভয় দলের কাছেই গ্রহণযোগ্য। সাধারণত সর্বসম্মতিক্রমেই স্পিকার নির্বাচিত হন।
তবে পূর্ববর্তী স্পিকার যদি সুস্থ, সক্ষম এবং পুনরায় দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হন, তাহলে তাঁকে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। অবশ্য ১৯৩৫, ১৯৫১ ও ১৯৭১ সালে স্পিকার নির্বাচন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল, যা ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচিত।
স্পিকারের যোগ্যতা: ব্রিটিশ কমন্সসভার স্পিকার হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তির নিম্নোক্ত যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন—
১. তিনি অবশ্যই কমন্সসভার সদস্য হতে হবে।
২. তাঁকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হতে হবে।
৩. তিনি দক্ষ, অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ হতে হবে।
৪. তাঁর নিয়োগে রাজা বা রানীর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন থাকতে হবে।
স্পিকারের বেতন ও ভাতা: কমন্সসভার স্পিকারের বেতন ও ভাতা সরকার নির্ধারণ করে। (ঐতিহাসিকভাবে পাঠ্যপুস্তকে উল্লেখ আছে যে, তাঁর বেতন সঞ্চিত তহবিল থেকে প্রদান করা হতো, যা আয়করমুক্ত ছিল। এছাড়া তিনি অতিরিক্ত ভাতা ও সরকারি বাসভবনের সুবিধা ভোগ করতেন।)
অবসর গ্রহণের পর তিনি অবসরভাতা লাভ করেন এবং প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তাঁকে আজীবন House of Lords-এর সদস্য (Life Peer) করা হয়।
স্পিকারের মেয়াদ: বর্তমানে স্পিকারের নির্দিষ্ট কোনো সাংবিধানিক মেয়াদ নেই। তিনি সাধারণত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং পুনর্নির্বাচিত হলে একাধিক মেয়াদেও দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
নতুন স্পিকার নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত পূর্ববর্তী স্পিকার তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। স্পিকার নির্বাচন পরিচালনার জন্য কমন্সসভার একজন জ্যেষ্ঠ সদস্যকে Speaker Pro Tem হিসেবে মনোনীত করা হয়, যিনি নির্বাচন পরিচালনা করেন।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা: স্পিকার যে রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবেই নির্বাচিত হোন না কেন, নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন না, সংসদীয় বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন না এবং দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকেন।
তবে কোনো বিষয়ে পক্ষে ও বিপক্ষে সমসংখ্যক ভোট পড়লে তিনি Casting Vote প্রয়োগ করতে পারেন।
স্পিকারের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে Clifton Brown বলেছেন— “As Speaker, I am not the Government's man, nor the Opposition's man. I am the House of Commons' man, and above all, the backbenchers' man.”
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, ব্রিটিশ কমন্সসভার স্পিকারের পদ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও কর্তৃত্বপূর্ণ একটি সাংবিধানিক পদ। সংসদের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সকল সদস্যের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিরপেক্ষ অবস্থানই এ পদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
এ প্রসঙ্গে Jennings বলেছেন— “Nothing illustrates more clearly the greatness of the British Constitution and the good sense of the British people than the office of the Speaker.”

إرسال تعليق