ব্রিটেনের কমন্সসভার সুযোগ-সুবিধাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের কমন্সসভার সুযোগ-সুবিধাসমূহ সম্পর্কে আলোচনা কর।

ভূমিকা: ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় কমন্সসভার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কার্যাবলি সম্পাদনের ক্ষেত্রে কমন্সসভাকেই প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। তাই যাতে এ সভার সদস্যরা দায়িত্ব পালনের সময় অহেতুক বাধার সম্মুখীন না হন, সে জন্য তাঁদের কিছু বিশেষ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কমন্সসভার সদস্যরা এসব সুবিধা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত—উভয়ভাবেই ভোগ করেন। মূলত তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও মর্যাদার কথা বিবেচনা করেই এসব বিশেষাধিকার প্রদান করা হয়েছে।

কমন্সসভার সুযোগ-সুবিধাসমূহ: ব্রিটিশ কমন্সসভার সদস্যদের বিশেষাধিকার প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। যথা—

ক. ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা
খ. সমষ্টিগত সুযোগ-সুবিধা

নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ক. ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা

১. বাক্‌স্বাধীনতা: ১৬৮৯ সালের Bill of Rights-এর মাধ্যমে কমন্সসভার সদস্যদের বাক্‌স্বাধীনতা স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ অধিকারের ফলে সদস্যরা সংসদে যেকোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে বক্তৃতা, বিতর্ক ও মতামত প্রকাশ করতে পারেন। সংসদে প্রদত্ত বক্তব্যের জন্য সংসদের বাইরে তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ আনা যায় না। এমনকি বক্তব্য প্রদানের সময় কেউ গোপন তথ্য প্রকাশ করলেও আদালত তাঁকে এ কারণে দণ্ড দিতে পারে না। তবে কমন্সসভার নিজস্ব নিয়ম ভঙ্গ করলে সংসদ নিজেই সংশ্লিষ্ট সদস্যকে তিরস্কার, সাময়িক বরখাস্ত বা অন্য শাস্তি দিতে পারে।

Bill of Rights (1689)-এ বলা হয়েছে—


“The freedom of speech and debates or proceedings in Parliament ought not to be impeached or questioned in any court or place out of Parliament.”

২. গ্রেপ্তার বা আটক না হওয়ার বিশেষ অধিকার: ফৌজদারি মামলা বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে কমন্সসভার সদস্যরা কোনো বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন না। তবে দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে তাঁরা বিশেষ সুরক্ষা পান। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার ৪০ দিন আগে থেকে অধিবেশনকাল এবং অধিবেশন শেষ হওয়ার ৪০ দিন পর্যন্ত কোনো সদস্যকে দেওয়ানি মামলায় গ্রেপ্তার করা যায় না।

৩. জুরি বা সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির না হওয়ার অধিকার: সাধারণ নাগরিকদের আদালতের নির্দেশে জুরি বা সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হতে হয়। কিন্তু সংসদের অধিবেশন চলাকালে কমন্সসভার কোনো সদস্যকে জুরি বা সাক্ষী হিসেবে আদালতে হাজির হতে বাধ্য করা যায় না। এর ফলে তাঁরা সংসদীয় দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হন না।

খ. সমষ্টিগত সুযোগ-সুবিধা

১. অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের অধিকার: ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষই নিজেদের কার্যপ্রণালি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের অধিকার ভোগ করে। কমন্সসভা নিজস্ব বিধি-বিধান প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে পারে। প্রয়োজনে সদস্যদের যোগ্যতা নির্ধারণ, শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য শাস্তি প্রদান কিংবা সদস্যপদ বাতিলের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করতে পারে। ফলে কমন্সসভা তার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম পরিচালনায় স্বাধীন ক্ষমতা ভোগ করে।

২. সংসদ অবমাননার জন্য শাস্তি প্রদানের অধিকার: কমন্সসভা সংসদের শৃঙ্খলা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য সংসদ অবমাননার অভিযোগে ব্যক্তি বা সদস্যকে তিরস্কার বা শাস্তি দিতে পারে। সংসদের সদস্য নন—এমন কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সংসদ সদস্যকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন বা সংসদের আদেশ বাস্তবায়নে বাধা দেন, তবে তা সংসদ অবমাননা হিসেবে গণ্য হয়।

Harvey and Bather বলেন—

“Contempt can occur when a non-member threatens or intimidates a Member of Parliament or when anybody is disobedient to or interferes with the execution of the orders of the House.”

এ ক্ষেত্রে কমন্সসভা—

অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সভায় উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিতে পারে;

তাঁকে সতর্ক বা তিরস্কার করতে পারে;

গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিতে পারে।

৩. সভাকক্ষে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের অধিকার:  কমন্সসভা প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সভাকক্ষে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে গোপন বৈঠক, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বা জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।

৪. কার্যবিবরণী প্রকাশের অধিকার: ১৮৪০ সালের Parliamentary Papers Act অনুযায়ী পার্লামেন্টের উভয় কক্ষই নিজেদের কার্যবিবরণী প্রকাশের অধিকার লাভ করে। ফলে সংসদের অনুমোদিত কার্যবিবরণী প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা যায় না।

গ. অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা

উপরোক্ত অধিকার ছাড়াও কমন্সসভা আরও কয়েকটি বিশেষাধিকার ভোগ করে। যেমন—

১. কমন্সসভা স্পিকারের মাধ্যমে রাজা বা রানীর নিকট তাদের বক্তব্য বা আবেদন উপস্থাপন করতে পারে।

২. রাজা বা রানী কমন্সসভার কার্যক্রম সম্পর্কে স্পিকারের মাধ্যমে অবহিত হন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন।

তবে আধুনিক সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে এসব অধিকার বর্তমানে মূলত আনুষ্ঠানিক গুরুত্ব বহন করে।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, কমন্সসভার সদস্যদের প্রদত্ত বিশেষাধিকার ও সুযোগ-সুবিধা ব্রিটিশ সংসদীয় শাসনব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব বিশেষাধিকার সদস্যদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংসদের মর্যাদা ও কার্যকারিতা রক্ষা করতে সহায়তা করে। তাই ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্রে কমন্সসভার ক্ষমতা, মর্যাদা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এসব বিশেষাধিকার অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন