ভূমিকা : সরকারের অঙ্গ হিসেবে বিচার বিভাগ যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এর অপরিহার্যতা একান্ত আবশ্যক। উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ব্রিটেনের বিচার বিভাগ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। বস্তুতপক্ষে, বিচার বিভাগই জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি। ব্রিটেনের বিচার বিভাগ সরকারের অপর দুটি বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদাসম্পন্ন। ব্রিটেনের বিচার বিভাগের মাধ্যমে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, ব্রিটেনের বিচার বিভাগ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উপায়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ওপর তার নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা প্রয়োগ করে থাকে।
বিচার বিভাগের বৈশিষ্ট্য : নিম্নে বিচার বিভাগের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো :
১. স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা : ব্রিটেনের বিচারপতিগণ সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং ক্ষমতা, নিরপেক্ষতা, পবিত্রতা ও তৎপরতার প্রতীক। শাসন বিভাগের ইচ্ছার ওপর তাঁদের পদে বহাল থাকা বা না থাকা নির্ভর করে না। ফলে বিচারপতিগণ কোনো রকম ভয় বা অনুগ্রহের বশবর্তী না হয়ে কর্তব্য সম্পাদন করে থাকেন।
২. অর্থের প্রভাব মূল্যহীন : ব্রিটেনের বিচারপতিদের ওপর মক্কেলরা অর্থের প্রভাব খাটাতে পারে না। অর্থাৎ, আমাদের এখানকার মতো ঘুষ দিয়ে বিচারপতিদের ক্রয় করা সেখানে সম্ভব নয়। যদিও এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ রয়েছে। যেমন—এর একটি কারণ হলো বিচারপতিদের অতি উচ্চ ভাতা এবং অন্য একটি কারণ হলো বিচার বিভাগের ঐতিহ্য, যা কয়েক শতাব্দী ধরে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
৩. দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি : এখানে মামলা-মোকদ্দমা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, ইংল্যান্ডের বিচারপতিগণ যথেষ্ট বিবেচনামূলক ক্ষমতা ভোগ করে থাকেন বলে এটি সম্ভব হয়ে থাকে। তাছাড়া, ব্রিটিশ জাতির সামাজিক ন্যায়বিচার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতা এর পেছনে কাজ করে।
৪. শিষ্টাচার ও লৌকিকতা : ইংল্যান্ডের বিচারালয়ে বিচারপদ্ধতি খুব সহজ নয় এবং এখনও এখানে অনেক পুরোনো শিষ্টাচার ও লৌকিকতা বিদ্যমান। আসলে, ব্রিটিশ জাতি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক, যা বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
৫. বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার অনুপস্থিতি : আমেরিকার মতো ইংল্যান্ডে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা নেই বললেই চলে। এখানে পার্লামেন্ট তার ইচ্ছামতো যেকোনো আইন পাস করতে পারে। কোনো আইন সাংবিধানিক নীতির পরিপন্থী কি না, তা নির্ধারণে বিচারালয়ের কোনো প্রক্রিয়া নেই।
৬. প্রশাসনিক বিচারালয়ের অনুপস্থিতি : ফ্রান্সের মতো গ্রেট ব্রিটেনে কোনো প্রশাসনিক বিচারালয় নেই। ফ্রান্সে দু’ধরনের বিচারালয় রয়েছে। যথা—ক. সাধারণ বিচারালয় ও খ. প্রশাসনিক বিচারালয়। কিন্তু ইংল্যান্ডে সব মামলা-মোকদ্দমা সাধারণ আদালতে গৃহীত হয় এবং সেখানে ফ্রান্সের মতো সরকারি কর্মচারীদের বিচারের জন্য কোনো বিশেষ আদালত নেই।
৭. জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা : ইংল্যান্ডের বিচার বিভাগ ও বিচারপতিগণ জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শাসনতন্ত্রে কতকগুলো মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ থাকে। কিন্তু ইংল্যান্ড এর ব্যতিক্রম, কারণ ব্রিটেনের শাসনতন্ত্রে কোনো মৌলিক অধিকার লিপিবদ্ধ অবস্থায় নেই। এ কাজটি বিচারপতিগণ পালন করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আইভর জেনিংস (Sir Ivor Jennings) বলেছেন, “The courts enjoy public esteem in the protection of liberty. It protects them against political interference and enables them to exercise their functions freely and fairly without favour and without fear.”
৮. আইন ও শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ : ব্রিটেনের বিচার বিভাগ আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকে। অর্থাৎ, এখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আইভর জেনিংস (Sir Ivor Jennings) মন্তব্য করেছেন, “One of the peculiarities of English history is that though the courts became subject to the authority of Parliament, they retained a great prestige.”
৯. জুরির সাহায্যে বিচারকার্য পরিচালনা : ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো জুরির সাহায্যে বিচারকার্য পরিচালনা করা। এর ফলে ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থা বহুলাংশে আইনের জটিলতা থেকে মুক্ত হয়েছে। সাধারণত বিভিন্ন বৃত্তি বা পেশায় নিয়োজিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে জুরি বোর্ড গঠিত হয়। জটিল দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার নিষ্পত্তির জন্য জুরি বোর্ডের সাহায্য নেওয়া হয়। এখানে অপ্রয়োজনীয় কোনো মামলার বিচার করা হয় না।
১০. লর্ডসভা সর্বোচ্চ আপিল আদালত : ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ লর্ডসভা সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে স্বীকৃত। তাই লর্ডসভা যাতে তার কার্য সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারে, সে কারণে বিচার বিভাগীয় সদস্যদের মধ্য থেকে লর্ডসভার সদস্য মনোনীত করা হয়ে থাকে।
১১. দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের প্রয়োগ : ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার সীমারেখা নেই। নিয়মানুযায়ী স্বতন্ত্র আদালতে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারকার্য পরিচালনার কথা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দেওয়ানি মামলা ফৌজদারি আদালতে এবং ফৌজদারি মামলা দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, দীর্ঘদিনের ক্রমবিকাশের ধারায় ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থায় ক্রমবিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থা নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদান, অপরাধীর শাস্তি প্রদান এবং নিরপরাধীকে অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাছাড়া, নতুন নতুন আইন প্রণয়ন ও আইনের ব্যাখ্যাও বিচার বিভাগ করে থাকে। ফলে, একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থা সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। আর সে কারণেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইংল্যান্ডের বিচারপতিগণ উচ্চ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন