ভূমিকা : সরকারের অঙ্গ হিসেবে বিচার বিভাগ যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। আর গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এর অপরিহার্যতা একান্ত আবশ্যক। উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ব্রিটেনের বিচার বিভাগ তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত একটি প্রতিষ্ঠান। বস্তুতপক্ষে, বিচার বিভাগই হলো জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার মূল চাবিকাঠি। ব্রিটেনের বিচার বিভাগ সরকারের অপর দুটি বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদাসম্পন্ন। ব্রিটেনের বিচার বিভাগের মাধ্যমে ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, ব্রিটেনের বিচার বিভাগ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উপায়ে প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ওপর তার নিয়ন্ত্রণমূলক ভূমিকা প্রয়োগ করে থাকে।
বিচার বিভাগের গঠন : ব্রিটেনের বিচার ব্যবস্থা দেওয়ানি ও ফৌজদারি—এই দুটি শাখায় বিভক্ত। দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের সংগঠন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। দেওয়ানি আদালতে ব্যক্তিগত অধিকার, দাবিদাওয়া ও সম্পত্তি বিষয়ক বিরোধের মীমাংসা করা হয়। অপরদিকে, ফৌজদারি আদালতে রাষ্ট্রবিরোধী বা সমাজবিরোধী অপরাধের বিচার ও শাস্তি প্রদান করা হয়।
দেওয়ানি প্রক্রিয়াভুক্ত আদালত: দেওয়ানি আদালতগুলো সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. কাউন্টি আদালত : ব্রিটেনে দেওয়ানি বিচারের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন আদালত হলো কাউন্টি আদালত। এ আদালত গঠিত হয় ১৮৪৬ সালে। একজন বিচারকের দ্বারা এ আদালতের বিচারকার্য সম্পাদিত হয়। এ বিচারপতি লর্ড চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত হন। কাউন্টি আদালতে অপেক্ষাকৃত কম অর্থসংক্রান্ত দাবিদাওয়ার বিচার করা হয়।
২. হাইকোর্ট অব জাস্টিস : দেওয়ানি মামলায় কাউন্টি আদালত থেকে আপিল করা হয় হাইকোর্ট অব জাস্টিসে। এ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। অপেক্ষাকৃত অধিক মূল্যের বিষয়, সম্পত্তি বা অর্থসম্পর্কিত দেওয়ানি মামলার বিচার এ আদালতে হয়ে থাকে। এ আদালতের তিনটি বিভাগ রয়েছে। যথা—
ক. রাজা বা রানীর বিভাগ (King or Queen's Bench Division),
খ. চ্যান্সারি বিভাগ (The Chancery Division) এবং
গ. পারিবারিক বিভাগ (Family Division)।
৩. আপিল আদালত : হাইকোর্টের উপর্যুক্ত তিন বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আদালতে আপিল করা যায়। লর্ড চ্যান্সেলরের সভাপতিত্বে উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারপতিকে নিয়ে আপিল আদালত গঠিত হয়। এ আপিল আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে লর্ডসভায় আপিল করা যায়। লর্ডসভাই হলো ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আপিল আদালত। আসলে, হাইকোর্ট অব জাস্টিসের তিনটি বিভাগ এবং আপিল আদালতকে নিয়ে ব্রিটেনের সুপ্রিম কোর্ট অব জুডিকেচার গঠিত।
ফৌজদারি প্রক্রিয়াভুক্ত আদালত : ফৌজদারি আদালতগুলো নিম্নরূপ :
১. ম্যাজিস্ট্রেট আদালত : ফৌজদারি ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন আদালত হলো ক্ষুদ্র দায়রা আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত। লর্ড চ্যান্সেলর এ আদালতের বিচারকদের নিযুক্ত করে থাকেন। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারি মামলার বিচার এ আদালতে হয়।
২. রাজা বা রানীর আদালত : ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের উপরে আছে রাজা বা রানীর আদালত। এ আদালত গঠিত হয় উচ্চ আদালতের বিচারপতি, সার্কিট বিচারপতি এবং রেকর্ডারদের নিয়ে।
৩. ঊর্ধ্বতন আপিল আদালত : রাজকীয় আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার আপিল বিচারের জন্য একটি ঊর্ধ্বতন আপিল আদালত আছে। এ আপিল আদালতই হলো লর্ডসভা। এ প্রসঙ্গে মুনরো বলেন, “The gamut of criminal justice in England therefore runs through summary jurisdiction, quarter sessions, assizes, court of criminal appeal and House of Lords.” [Munro, The Governments of Europe, p. 263]
অন্যান্য আদালত: দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত ছাড়াও ব্রিটেনের আধুনিক বিচারব্যবস্থায় আরও দুই ধরনের আদালতের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো :
৪. প্রিভি কাউন্সিলের বিচার বিভাগীয় কমিটি : ব্রিটেনে প্রিভি কাউন্সিলের বিচার বিভাগীয় কমিটি নামে একটি বিচার বিভাগীয় সংস্থা আছে। লর্ড চ্যান্সেলর, প্রাক্তন লর্ড চ্যান্সেলরগণ এবং আইনগত লর্ডদের নিয়ে এ বিচার সংস্থা গঠিত হয়। প্রিভি কাউন্সিলের বিচার কমিটি হলো ব্রিটেনের ধর্মীয় আদালতগুলোর আপিল বিচারের সর্বোচ্চ আদালত। যাজকীয় আদালত, প্রাইজ আদালত এবং ব্রিটিশ ডোমিনিয়ন ও উপনিবেশগুলোর ঊর্ধ্বতন আদালতসমূহের রায়ের বিরুদ্ধে প্রিভি কাউন্সিলের বিচার কমিটির কাছে আপিল করার ব্যবস্থা আছে। তবে এখন ব্রিটেনের উপনিবেশগুলো স্বাধীনতা লাভ করেছে এবং ব্রিটিশ ডোমিনিয়নগুলোর অধিকাংশই প্রিভি কাউন্সিলের বিচার কমিটির কাছে আপিলের ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ কারণে এ কমিটির গুরুত্ব বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে।
৫. বিশেষ আদালত : প্রশাসনিক আদালত, কোর্ট মার্শাল, কারবার কোর্ট ও রেস্ট্রিকটিভ প্র্যাকটিস কোর্ট প্রভৃতি বিশেষ আদালতের অস্তিত্ব ব্রিটেনের বিচারব্যবস্থায় পরিলক্ষিত হয়।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ বিচার বিভাগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। ঐতিহ্যগতভাবে সে দেশের শাসন বিভাগ ও আইন বিভাগ বিচার বিভাগের কাজে হস্তক্ষেপ করে না। ব্রিটেনের আদালত দুই ধরনের। যথা : দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালত। দেওয়ানি মামলার বিচার করে দেওয়ানি আদালত এবং ফৌজদারি মামলার বিচার করে ফৌজদারি আদালত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন