ভূমিকা : যে কোনো দেশের আমলাতন্ত্রের স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা প্রতিরোধ করে আমলাদের প্রত্যাশিত সততা, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং সংহতি রক্ষা করা প্রয়োজন। তাছাড়া জনসাধারণের প্রতি আমলাদের সংবেদনশীলতা ও নিয়মিত যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এ কথা ব্রিটেনের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু বর্তমানে ব্রিটেনের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। সে কারণে ব্রিটেনের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জনমুখী করে তোলার জন্য তাদের নিয়ন্ত্রণ একান্ত আবশ্যক।
ব্রিটেনের আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ: নিম্নে ব্রিটেনের আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরা হলো :
১. উপযুক্ত প্রশিক্ষণ : আমলাতন্ত্রের কিছু দোষ-ত্রুটির প্রতিকারের ব্যাপারে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার কথা বলা হয়। এ ক্ষেত্রে আমলাদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আমলাতন্ত্রের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।
২. মানসিকতার পরিবর্তন : আমলাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব তৈরি করার মাধ্যমেও আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
৩. আত্মঅহমিকা দূরীকরণ : তাছাড়া আমলাদের ভেতর থেকে আত্মঅহমিকার ভাবও দূর করা দরকার। প্রকৃতপক্ষে, আত্মঅহংকার বা আত্মঅহমিকা দূর করা গেলে আমলাদের আরও বেশি জনমুখী করে তোলা সম্ভব হবে।
৪. প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন : আমলাতন্ত্রের ত্রুটি দূর করার ব্যাপারে কিছু বাহ্যিক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়। পার্লামেন্টের মাধ্যমে এসব বাহ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। আমলাতন্ত্রের কাজকর্ম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে পার্লামেন্ট প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে পারে। তাছাড়া কমন্সসভার সদস্যদের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও আমলাদের স্বৈরাচারী মানসিকতাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
৫. বিচার বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ : আমলাতন্ত্রের ওপর বিচার বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণের কথাও বলা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক আদালতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমলাদের দুর্নীতি, কর্তব্যে অবহেলা প্রভৃতি প্রশাসনিক আদালতের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়।
৬. উপযুক্ত বেতন প্রদান : বেসামরিক প্রশাসনের সমস্যা দূরীকরণে সরকারি কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতন প্রদান করা জরুরি। কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ পেলে তারা অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের কোনো রকম চেষ্টা করবেন না বা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করার জন্য আগ্রহী হবেন না।
৭. পার্লামেন্টারি কমিশনার ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন : আমলাতন্ত্রের সমস্যা দূরীকরণে ১৯৬৬ সালে ‘পার্লামেন্টারি কমিশনার ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ পদ সৃষ্টি করা হয়। এটি ইউরোপের অন্যান্য দেশে প্রচলিত ‘ন্যায়পাল’ (Ombudsman) পদটির অনুরূপ। ব্রিটিশ নাগরিক, কোনো সংস্থা বা কোম্পানি অথবা পার্লামেন্টের সদস্য কর্তৃক প্রেরিত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করার দায়িত্ব হচ্ছে পার্লামেন্টারি কমিশনারের।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা এত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা এত তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে যে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সিভিল সার্ভিস পদ্ধতিতে এমনটি হয়নি। বর্তমানে তা এক ‘নব্য স্বৈরতন্ত্রের’ জন্ম দিতে চলেছে। এ প্রবণতা রোধকল্পে সাম্প্রতিককালে সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার সংস্কারের বহু প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার মধ্যে ১৯৬৬ সালের ‘ফুলটন কমিটির রিপোর্ট’ (Fulton Committee Report) অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। লর্ড ফুলটনের নামানুসারে এ রিপোর্টের নামকরণ করা হয়। রিপোর্টটি পার্লামেন্টে উত্থাপনের সময় ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একে তার দেশের মৌলিক সংগঠনসমূহ আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি অত্যাবশ্যকীয় দান বলে অভিহিত করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন