ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের সমস্যাসমূহ আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের সমস্যাসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বর্তমানে কতকগুলো ত্রুটি বিদ্যমান। ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার চেহারা ও চরিত্রের সঙ্গে এসব ত্রুটি বা সমস্যা ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত। আর সে কারণে বর্তমানে ব্রিটেনের সিভিল সার্ভিস তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন।

ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের সমস্যা: প্রকৃতপক্ষে, ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের সমস্যাগুলো আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বিভিন্ন ত্রুটি-বিচ্যুতির সঙ্গে সম্পর্কিত। নিম্নে এসব সমস্যা তুলে ধরা হলো :

১. আমলাদের গুণগত মান হ্রাস : বর্তমানে ব্রিটেনের বেসরকারি সংস্থাগুলোতে চাকরির আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। যার ফলে উন্নত গুণগত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা এসব বেসরকারি চাকরির প্রতি অধিক পরিমাণে আকৃষ্ট হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞের পদগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অধিক সংখ্যায় বেসরকারি সংস্থায় যোগ দেওয়ায় রাষ্ট্রকার্যে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অভাব ঘটছে। ফলে আমলাদের গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে।

২. পদোন্নতিজনিত সমস্যা : পদোন্নতির ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে নিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। সরকারি চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিলম্ব ও সীমিত সম্ভাবনা যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের বিমুখ করে। অপরপক্ষে, বেসরকারি সংস্থাসমূহে যোগ্যতার বিশেষ কদর করা হয়। বিচক্ষণ ব্যক্তিরা সত্বর এবং সহজেই উচ্চ পদে যেতে পারেন। এ কারণেও যোগ্য ব্যক্তিরা রাষ্ট্রকার্যে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ পান না।

৩. আত্মঅহমিকা : ব্রিটেনে আমলাদের মধ্যে আত্মঅহমিকা বেশ প্রকট। তারা দেশবাসীর মধ্যে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ শ্রেণিভুক্ত বলে মনে করেন। তাদের ধারণা, দেশ ও দেশবাসীর যাবতীয় সমস্যা এবং তার সমাধান সম্পর্কে তারাই ওয়াকিবহাল। আর এ ধারণার কারণে মন্ত্রীদের সঙ্গে মাঝে মাঝে আমলাদের বিরোধ দেখা দেয়।

৪. প্রশিক্ষণের অভাব : ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা নেই। পরিচালন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কৌশলগত শিক্ষায় আমলাদের শিক্ষিত করারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এর ফলে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে প্রশাসকদের পরিচালনাগত দক্ষতার অভাব দেখা দেয়।

৫. আমলাদের স্বৈরাচারী মনোভাব : ব্রিটেনে আমলাদের মধ্যে স্বৈরাচারী হয়ে পড়ার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। বর্তমানে ক্যাবিনেটের একনায়কত্বের ফলে আমলাদের স্বৈরী ক্ষমতাও সম্প্রসারিত হয়। শাসন বিভাগের কাজকর্মের চৌহদ্দি ও ক্ষমতার পরিধি প্রসারিত হওয়ায় এবং অর্পিত ক্ষমতাপ্রসূত আইনের বিস্তার ঘটায় আমলাতন্ত্র অতিমাত্রায় ক্ষমতাশালী হয়ে পড়ছে।

৬. পদ্ধতিগত ত্রুটি : ব্রিটেনের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কর্মচারী পরিচালনা পদ্ধতির ক্ষেত্রে নানাবিধ ত্রুটি রয়েছে। বৃত্তি পরিকল্পনা ও সার্ভিসের ব্যবস্থাও কেবল প্রশাসনিক শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সুতরাং, এটি সমগ্র সিভিল সার্ভিসের জন্য অপর্যাপ্ত এবং সঠিকভাবে পরিকল্পিতও নয়।

৭. লাল ফিতার শাসন : লাল ফিতার শাসন (Red Tapism) ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের একটি প্রধান দুর্বলতা। বস্তুতপক্ষে, ব্রিটেনের আমলারা তাদের বিভিন্ন ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ লাল ফিতার শাসন কায়েম করেন। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সেবার মান যথাযথভাবে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।

তাছাড়া, আনুষ্ঠানিকতার আধিক্য, দীর্ঘসূত্রতা, ঔদাসীন্য, রুটিনমাফিক কাজ, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া প্রভৃতি আমলাতন্ত্রের চিরাচরিত দোষ-ত্রুটির দ্বারা ব্রিটেনের আমলাতন্ত্রও আক্রান্ত।

৮. স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর চাপ : অনেক সময় আমলারা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ব্রিটেনের বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের গোষ্ঠীর স্বার্থে আমলাদের প্রভাবিত করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেয়। ফলে বৃহত্তর স্বার্থের মৃত্যু ঘটে এবং দেশ ও জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

৯. অন্যান্য সমস্যা : উপর্যুক্ত সমস্যাসমূহ ছাড়াও ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসনে আরও কতিপয় সমস্যা বিদ্যমান। ‘ফুলটন কমিটি’র রিপোর্টে আরও যেসব সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা হলো—

ক. সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা অপর্যাপ্ত।
খ. সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের যোগাযোগের অভাব।
গ. সরকারি কর্মচারীদের উপেক্ষাকারী মনোভাব।
ঘ. সরকারি কর্মচারীদের স্তরবিন্যাসজনিত সমস্যা।
ঙ. প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া।
চ. আনুষ্ঠানিকতার আধিক্য, কাজের দীর্ঘসূত্রতা, রুটিনমাফিক কাজ প্রভৃতি।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা এত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা এত তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে যে, পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের সিভিল সার্ভিস পদ্ধতিতে এমনটি হয়নি। বর্তমানে তা এক ‘নব্য স্বৈরতন্ত্রের’ জন্ম দিতে চলেছে। এ প্রবণতা রোধকল্পে সাম্প্রতিককালে সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থার সংস্কারের বহু প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছে এবং তার মধ্যে ১৯৬৬ সালের ‘ফুলটন কমিটি’র রিপোর্ট অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। রিপোর্টটি পার্লামেন্টে উত্থাপনের সময় ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী একে তার দেশের মৌলিক সংগঠনসমূহ আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি অত্যাবশ্যকীয় দান বলে অভিহিত করেন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন