ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা কর।

ভূমিকা : ই. এন. গ্ল্যাডেনের ভাষায়, “সিভিল সার্ভেন্টগণ নিরপেক্ষভাবে বাছাইকৃত, প্রশাসনিক দিক দিয়ে যথাযোগ্য, রাজনৈতিক দিক দিয়ে পক্ষপাতশূন্য এবং সেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হলে—এটাই সিভিল সার্ভিসের ক্ষেত্রে আবশ্যক।” উক্তিটি থেকে এটা স্পষ্ট যে, ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের কতকগুলো সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের বৈশিষ্ট্যসমূহ: নিম্নে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো :

১. অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টগণ রাষ্ট্রের সেবক হলেও তারা রাজনৈতিক দিক থেকে নিরপেক্ষ। তাদের কাউকে রাজনৈতিক কারণে নিয়োগ দেওয়া হয় না, আবার কাউকে রাজনৈতিক কারণে অপসারণও করা হয় না। ফলে সরকারের পরিবর্তন হলেও সিভিল সার্ভেন্টগণ স্ব-স্ব পদে বহাল থাকেন।

২. ক্যারিয়ার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস ক্যারিয়ার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। এর সকল সদস্য এই সার্ভিসকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন বলে মনে করা হয়। নবীন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ—সকলেই ক্যারিয়ার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। কোনো সিভিল সার্ভেন্ট তার ‘প্রোবেশনারি পিরিয়ড’ উত্তীর্ণ করে স্থায়ীভাবে চাকরিতে বহাল হন এবং যুক্তিসংগত বেতন ও ভবিষ্যৎ উন্নতির সম্ভাবনাময় কর্মজীবনে আত্মনিয়োগ করেন। ব্যক্তিগত অসদাচরণ কিংবা দুর্নীতির কারণ ব্যতীত রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে তাদের অপসারণ করা যায় না।

৩. নিরপেক্ষ ও অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টগণ নিরপেক্ষ ও অবাধ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিয়োগ লাভ করে থাকেন। এখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় না; বরং নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রার্থীর সাধারণ জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতা যাচাই করা হয়।

৪. বৈষম্যহীন আচরণ : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের সদস্যগণ সকলের সঙ্গে সমরূপ আচরণ করে থাকেন। অনেক সময় দেখা যায়, সিনিয়র সিভিল সার্ভেন্টগণ দেশ-বিদেশে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করেন। তবে তা রাজনৈতিক মতবাদ, ধর্মগত পার্থক্য, বর্ণ বা শ্রেণিগত পার্থক্যের কারণে নয়। তাদের এ ধরনের আচরণ মূলত পরিস্থিতির চাপ কিংবা সমস্যার তীব্রতার কারণে হয়ে থাকে।

৫. নিরপেক্ষতা : রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত না হওয়ার কারণে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টগণ নিরপেক্ষভাবে তাদের কার্যাদি সম্পাদন করে থাকেন। এছাড়া কোনো বিশেষ দলকে সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে তারা উদ্যমশীলতার সঙ্গে সরকারের সেবা এবং সরকারি নীতিসমূহের বাস্তবায়ন করে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৪৯ সালে ব্রিটেনে লেবার পার্টির সরকার লৌহ ও ইস্পাত শিল্প জাতীয়করণের নীতি গ্রহণ করে এবং ১৯৫১ সালে কনজারভেটিভ পার্টি তা অনুসরণ করে। উভয় সরকারের এ নীতি বাস্তবায়িত হয়েছিল মূলত সিভিল সার্ভিসের একই কর্মকর্তাদের মাধ্যমে।

৬. অজ্ঞাতনামা থাকা : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টগণ তাদের কার্যাবলির জন্য ব্যক্তিগতভাবে জনগণের নিন্দা বা প্রশংসার দাবিদার না হয়ে বরং লোকচক্ষুর অন্তরালে অজ্ঞাতনামা হিসেবে কাজ করেন। এ প্রসঙ্গে প্যাগফিল্ড বলেন, “কোনো দপ্তরের সকল সিভিল সার্ভেন্টই তাদের রাজনৈতিক প্রধানের প্রতি অনুগত থাকেন। মন্ত্রী পার্লামেন্ট বা জনসমক্ষে যাতে কোনো হতবুদ্ধিকর পরিস্থিতিতে না পড়েন, তারা সেদিকে দৃষ্টি রাখেন। সেজন্য তারা মন্ত্রীর নীতি বিশ্বস্তভাবে কার্যকর করেন, যথাসম্ভব সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে উপযুক্ত প্রশাসনিক রীতিনীতি অনুসরণ করেন এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করেন।”

৭. দুর্নীতিমুক্ত : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস প্রায় সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত। এ কারণে ব্রিটিশরা গর্ববোধ করে। হারবার্ট মরিসন মন্তব্য করেছেন, “আমরা ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের জন্য গর্ববোধ করি। সামগ্রিকভাবে সিভিল সার্ভেন্টগণ সুদক্ষ, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও সম্পূর্ণভাবে সৎ। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, উৎকোচ গ্রহণ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা প্রভৃতি কোনো কাজে তাদের দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা বিরল।”

৮. জবাবদিহিতা : ব্রিটিশ মন্ত্রিগণ যেমন তাদের কাজকর্মের জন্য পার্লামেন্টের নিকট দায়ী থাকেন, তেমনি সিভিল সার্ভেন্টগণ তাদের কাজকর্মের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রীর কাছে দায়ী থাকেন। কারণ নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের জবাবদিহি পার্লামেন্টে মন্ত্রীকেই করতে হয়। ফলে মন্ত্রিগণ পার্লামেন্টে সমালোচিত হওয়ার ভয়ে নিজ দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে থাকেন।

৯. আনুগত্যবোধ : আনুগত্যবোধ ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। সিভিল সার্ভেন্টগণ সর্বদাই দপ্তরপ্রধানের প্রতি অনুগত থেকে সরকারের সার্বিক পরিচালনায় সাহায্য করে থাকেন। মন্ত্রিগণ যাতে কোনো রূপ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে না পড়েন, সেদিকে তারা সুদৃষ্টি রাখেন এবং মন্ত্রীর নির্দেশাবলি যথাযথভাবে পালন করে থাকেন।

১০. অপ্রকাশ্যে কাজকর্ম পরিচালনা : ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্টগণ অপ্রকাশ্যে তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করে থাকেন। তাদের কাজকর্ম মন্ত্রীর কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও জনগণের কাছে তা সাধারণত প্রকাশ পায় না। জনগণ মনে করে যে, কাজটি মন্ত্রীর দ্বারাই সম্পাদিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে লর্ড হিউমার মন্তব্য করেছেন যে, তারা বাইরে অপরিচিত। তারা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না; বরং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটান। তারা অনেকটা ভিক্টোরীয় যুগের যাজকদের মতো, যাদের কোনো সামাজিক জীবন নেই।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, বর্তমান প্রশাসন ব্যবস্থায় সিভিল সার্ভেন্টগণ রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও কার্যাবলি নির্দেশ করে থাকেন। সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ বা নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নয়, বরং সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। তাই ব্রিটেনের সিভিল সার্ভিস সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত। এ ব্যবস্থা সরকারকে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিশাল দায়িত্ব পালন করে চলছে। এ কারণেই গ্রাহাম ওয়ালস বলেছেন যে, “এ ব্যবস্থার সৃষ্টিই উনিশ শতকে ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উদ্ভাবন।”

Post a Comment

أحدث أقدم