ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের উৎপত্তি সম্পর্কে আলোচনা কর।

ভূমিকা : আধুনিককালের প্রশাসনিক ব্যবস্থা পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, দিন দিন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। পূর্বে কোনো রাজা বা মহারানি সমগ্র দেশকে একটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনযন্ত্রের সাহায্যে যথেষ্ট প্রতাপের সঙ্গে শাসন করতেন। কিন্তু অধুনা অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গৃহীত হয়েছে। তাই আঞ্চলিক তথা স্থানীয় সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধানকল্পে স্থানীয় সরকারসমূহকে যথেষ্ট স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু ব্রিটেনের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্থানীয় সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা একটি আদর্শ ঘটনা।

ব্রিটেনে স্থানীয় সরকারের উৎপত্তি: গ্রেট ব্রিটেনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। প্রথমত অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত অবস্থায় এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি একটি পরিকল্পিত কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ আলোচনা করা হলো :

১. অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগ : অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজাদের আমলে ব্রিটেনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। পণ্ডিত ব্যক্তিরা ধারণা করেন যে, এ সময়ে ইংল্যান্ড কতকগুলো ‘শায়ার’-এ বিভক্ত ছিল এবং প্রতিটি শায়ার আবার কয়েকটি ‘শত’-এ বিভক্ত ছিল। কাজের সুবিধার জন্য প্রতিটি ‘শত’কে কয়েকটি ‘তুন’ বা ‘পরিখে’-তে বিভক্ত করা হয়। সাধারণত পরিখেগুলো মৌজা-সংক্রান্ত ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং কৃষি-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনার জন্য জনগণ প্রায়ই পরিখেতে একত্রিত হতো।

২. ‘জাস্টিস অব পিস’ পদ সৃষ্টি : চতুর্দশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার গতানুগতিক ধারায় চলছিল। অতঃপর ১৩২৭ সালে সর্বপ্রথম ‘জাস্টিস অব পিস’ পদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রশাসন ও বিচারকার্য পরিচালনা, রাস্তাঘাট, সেতু ইত্যাদির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ‘জাস্টিস অব পিস’-এর ওপর ন্যস্ত করা হয়। টিউডর আমলে জাস্টিস অব পিসের দায়িত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে পরিবেশ তদারকির দায়িত্বও তাদের ওপর ন্যস্ত হয়।

৩. বরো ব্যবস্থার বিকাশ : ব্রিটেনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সপ্তদশ শতকে ‘বরো’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। এর ফলে স্থানীয় সরকার ভিন্ন আকার ধারণ করে। এ সময়ে বরো কর্তৃপক্ষ রাজার হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালায়। ফলশ্রুতিতে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে প্রশাসন দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা—পার্লামেন্টারীয় ও স্থানীয়।

৪. শিল্পবিপ্লব ও মিউনিসিপ্যাল অ্যাক্ট : ইউরোপের শিল্পবিপ্লব ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। শিল্পবিপ্লবের ফলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠতে থাকে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ কাজের আশায় শহরে এসে ভিড় করে। এর ফলে গ্রামের কৃষি কাঠামো ভেঙে পড়ে। কিন্তু শহরের শিল্পভিত্তিক সমাজ এবং গ্রামের কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামো ভিন্ন হওয়ায় স্থানীয় সরকার বিদ্যমান কৃষিভিত্তিক কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। এ প্রসঙ্গে হার্ডে ও ব্যাথার বলেন, “Although economic factors produced a breakdown of local government, nothing was done until the political climate changed in the 1830's.” এমতাবস্থায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ১৮৩৫ সালে মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট পাস করা হয়।

৫. ১৮৮৮ সালের আইন : ১৮৩৫ সালের মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হলে ১৮৮৮ সালে স্থানীয় সরকার আইন পাস করা হয়। এ আইনের অধীনে স্থানীয় সরকারকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করা হয়। যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হয়, তা হলো—

ক. ৬১টি কাউন্টি পরিষদ গঠন।
খ. জাস্টিস অব পিসের হাতে অতীতে যে ক্ষমতা ছিল, তা কাউন্টি পরিষদের হাতে হস্তান্তর।
গ. জাতীয় সড়ক, গাছপালা, খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল প্রভৃতি বিষয়ের দায়িত্ব কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করা।

কিন্তু দেখা যায় যে, এ আইনের মাধ্যমে আশানুরূপ সাফল্য না আসায় ১৮৯৪ সালে পুনরায় স্থানীয় সরকার আইন পাস করা হয়।

৬. রাজকীয় কমিশন গঠন : স্থানীয় সরকার সংস্কারে ১৮৩৫ ও ১৮৮৮ সালে যে আইন প্রণয়ন করা হয়, তা কিছু কিছু অসুবিধা দূর করলেও সম্পূর্ণভাবে তা দূর করতে সক্ষম হয়নি। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুর্বলতা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। এমতাবস্থায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচিত লেবার পার্টির স্থানীয় সরকারমন্ত্রী রিচার্ড ক্রশম্যানের উদ্যোগে রেডক্লিফ-মডের নেতৃত্বে একটি রাজকীয় কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশন ১৯৫৪ সালে তাদের প্রতিবেদন পেশ করে। ওই কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব বিষয়ে সুপারিশ করা হয়, তা হলো—

ক. পুরোনো আমলের সরকার কাঠামো ভেঙে ফেলতে হবে।
খ. দ্বিস্তরীয় কর্তৃপক্ষ বাতিল করে ৫৮টি এককেন্দ্রিক কর্তৃপক্ষ স্থাপন করতে হবে।
গ. মেট্রোপলিটন জেলা স্থাপন করতে হবে।

৭. স্থানীয় সরকার আইন, ১৯৭২ : রাজকীয় কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পূর্বেই লেবার পার্টির পতন ঘটে এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কনজারভেটিভ পার্টি সরকার গঠন করে। নবগঠিত সরকার পূর্বের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে নিজেরাই নতুন উদ্যোগে স্থানীয় সরকার আইন, ১৯৭২ পাস করে। ওই আইনের অধীনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজানো হয়। ১৯৭২ সালের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়, তা হলো—

ক. ইংল্যান্ড ও ওয়েলসকে ৪৭টি কাউন্টি, ৬টি মেট্রোপলিটন কাউন্টি ও বৃহত্তর লন্ডন পরিষদে ভাগ করা হয়।
খ. ৪৭টি কাউন্টির অধীনে ৩৩৩টি জেলা রাখা হয়।
গ. ৬টি মেট্রোপলিটন কাউন্টির অধীনে ৩৬টি মেট্রোপলিটন জেলা রাখা হয়।
ঘ. বৃহত্তর লন্ডন পরিষদের অধীনে ৩২টি লন্ডন বরো এবং লন্ডন শহর রাখা হয়।
ঙ. ইংল্যান্ডে প্যারিশ এবং ওয়েলসে কমিউনিটি ব্যবস্থা রাখা হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে স্কটল্যান্ডের স্থানীয় সরকারের জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এতে স্কটল্যান্ডকে ৯টি অঞ্চলে এবং ৫৩টি জেলায় ভাগ করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিলফ ও পিল বলেন, “নতুন আইনের পশ্চাতে রক্ষণশীল সরকারের বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। এ উদ্দেশ্যটি হলো স্থানীয় শাসনব্যবস্থার মধ্যে রাজনীতির অনুপ্রবেশ সহজ করে তোলা। সেটি সম্ভব হয়েছে। রাজনীতি বিষয়ে স্থানীয় সরকারগুলো অতীতের তুলনায় অধিকতর সচেতন।”

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, গ্রেট ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল। প্রথমত অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত অবস্থায় এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এটি একটি পরিকল্পিত কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

Post a Comment

أحدث أقدم