ভূমিকা : উদার গণতন্ত্রের ধারক ব্রিটেনের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একটি উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থা শুধু ব্রিটেনের জাতীয় প্রশাসনের সঙ্গেই জড়িত নয়, বরং স্থানীয় ব্যবস্থা জাতীয় জীবনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত। এর ফলে স্থানীয় সরকার বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম সম্পাদন করে থাকে।
ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের ভূমিকা: নিম্নে ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের ভূমিকা আলোচনা করা হলো :
১. গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তোলার ক্ষেত্রে : ব্রিটেনে প্রচলিত পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দেশের আপামর জনগণ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত নয়। কারণ জনগণের পক্ষে সহজেই এ সরকারের কাছে তাদের মতামত বা দাবিদাওয়া জানানো সম্ভব নয়। তাছাড়া একজন প্রতিনিধির পক্ষে বিশাল সংখ্যক ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাও সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। স্থানীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় জনগণ খুব সহজেই যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে এবং তাদের দাবিদাওয়া ও মতামত জানাতে পারে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে তা কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট পৌঁছে যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, গণতন্ত্র যে জনগণের শাসন ও জনগণের জন্য শাসন—তা ব্রিটেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার কারণেই। আর তা না হলে হয়তো ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাগজে-কলমেই থেকে যেত। জনগণ এর স্বাদ গ্রহণ করতে সমর্থ হতো না।
২. জাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে : ব্রিটেনের জাতীয় রাজনীতি নিয়ন্ত্রণেও স্থানীয় সরকারের ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের ওপর জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে থাকে। কেননা স্থানীয় সরকার যদি সুষ্ঠুভাবে তার দায়িত্ব সম্পাদন না করত, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের চাপ বৃদ্ধি পেত এবং জনগণের দাবিদাওয়া পূরণে ব্যর্থ হতো। কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে এবং জনগণের চাহিদা ও মতামত সম্পর্কে অবগত হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার সহজেই তার করণীয় নির্ধারণ ও তা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে সক্ষম হয়। অতএব বলা যায় যে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করে থাকে।
৩. জাতীয় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে : একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনে বেকার সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কেননা স্থানীয় সরকারগুলোতে অনেক লোক কাজ করে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার যত বেশি কল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করবে, তত বেশি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় সরকার সমাজসেবা, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দুপুরের খাবার বিতরণ, দুগ্ধ বিতরণ প্রভৃতি কাজও সম্পাদন করে থাকে।
৪. জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা : কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের ভার লাঘব এবং সুষ্ঠুভাবে কার্যাবলি সম্পাদনের জন্যই স্থানীয় সরকারকে এ-সংক্রান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার যেসব জনসেবামূলক কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—শিক্ষা, বাসস্থান, শিশু ও বৃদ্ধদের পরিচর্যা, পয়ঃনিষ্কাশন, উদ্যান সংরক্ষণ, রাস্তাঘাট মেরামত, সেতু সংরক্ষণ, যুবকদের কর্মে নিয়োগ প্রভৃতি।
৫. পরিবেশ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা : ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার পরিবেশ-সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত। পরিবেশকে উন্নত ও উপযোগী করে তোলা, আবর্জনা ও ময়লার স্তূপীভবন রোধ, পার্ক, উদ্যান ও খেলার মাঠ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, হাইওয়েগুলোকে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে তোলা, রাস্তাঘাট আলোকিত রাখা ইত্যাদি কার্যাবলিও স্থানীয় সরকার পরিচালনা করে থাকে।
৬. রক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা : ব্রিটেনের স্থানীয় সরকার জনকল্যাণমূলক কাজের পাশাপাশি রক্ষামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করে থাকে। বিশেষ করে ভোক্তার স্বার্থরক্ষা, রাস্তার নিরাপত্তা রক্ষা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ, বেসামরিক প্রতিরক্ষা, পুলিশ ও দমকল বাহিনী প্রভৃতি রক্ষামূলক কাজের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারের ওপর ন্যস্ত থাকে।
৭. ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে : ব্রিটেনের স্থানীয় সরকারের হাত ধরেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ক্রিয়াকলাপের সম্প্রসারণ ঘটে থাকে। কেননা স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই জাতীয় রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে রাজনীতির শিক্ষানবিশ সময় অতিক্রম হয়।
৮. কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যকারী সংস্থা হিসেবে : ব্রিটিশ স্থানীয় সরকারের সাহায্যেই শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারের সহায়তায় তৃণমূল পর্যায়ে নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, কর সংগ্রহ এবং আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে বেগ পেতে হয় না। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, স্থানীয় পর্যায়ে নীতি বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যকারী সংস্থা হিসেবে স্থানীয় সরকার কাজ করে।
৯. ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের ক্ষেত্রে : যেসব স্থানে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে, সেসব স্থানের ওপর নজর রাখা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধন করা স্থানীয় সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এছাড়া যেসব ব্যবসা-বাণিজ্য স্থানীয় কাঁচামালের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, সে ব্যাপারে স্থানীয় সরকার সাহায্য করে থাকে, যেন ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন সাধিত হয়।
১০. জাতীয় সেবাদানের ক্ষেত্রে : কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিক জীবন সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য যেসব সেবামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে, তার বাস্তবায়ন ঘটে মূলত স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ, আবর্জনা অপসারণ, উদ্যান সংরক্ষণ, পয়ঃনিষ্কাশন, সেতু সংরক্ষণ, রাস্তাঘাট মেরামত প্রভৃতি কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের চাপ হ্রাস করতে সাহায্য করে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, ব্যক্তিজীবনের সর্বাধিক কল্যাণ সাধনে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। ব্রিটেনের জনগণের এমন কোনো দিক নেই, যা স্থানীয় সরকারের আওতাভুক্ত হয়নি। শিক্ষা, চাকরি, নিরাপত্তা ও মানসিক বিকাশ থেকে শুরু করে ব্যক্তিকে সর্বাধিক আরাম, সুযোগ ও নিরাপত্তা দেওয়াই হচ্ছে স্থানীয় সরকারের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। ফলে জনগণ স্থানীয় সরকারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত হয়ে পড়ে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের কাজের সুষ্ঠু সম্পাদন, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন