রাজনীতি অধ্যয়নে গ্রুপতত্ত্বের ভূমিকা আলোচনা কর


প্রশ্ন: রাজনীতি অধ্যয়নে গ্রুপতত্ত্বের ভূমিকা আলোচনা কর।

ভূমিকা : Arthur F. Bentley যথার্থই বলেছেন— “When the groups are adequately stated everything is stated. When I say everything, I mean everything.” রাজনীতি বিশ্লেষণে গ্রুপতত্ত্বের ভূমিকা সত্যিই অপরিসীম। এর জন্ম বহুত্ববাদী চিন্তা থেকে। এলিট তত্ত্ব রাজনৈতিক বাস্তবতাকে যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বহুত্ববাদে গুরুত্ব আরোপ করেন। বহুত্ববাদের মূল বক্তব্য হলো— ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু একক নয়; বরং সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন গ্রুপ ও শ্রেণী মিলেই রাষ্ট্রীয় রাজনীতি গঠিত হয়। ফলে কোনো দেশের রাজনীতি বুঝতে হলে সে দেশের গ্রুপ-সংগঠনগুলোকে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। এ কারণেই গ্রুপতত্ত্বের প্রবক্তারা গ্রুপকেই রাজনীতি অধ্যয়নের প্রধান একক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজনীতি অধ্যয়নে গ্রুপতত্ত্বের ভূমিকা

গ্রুপতত্ত্ব বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় গ্রুপতত্ত্বকে স্বকীয় ও কার্যকর গবেষণা-পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়। তাই একে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘Heart of Politics’ বলা হয়। এর মূল গুরুত্ব নিম্নরূপ—

১. রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষা: রাজনীতি গতিশীল হলেও এর কিছু কাঠামোগত দিক স্থিতিশীল থাকে। গ্রুপতত্ত্ব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে এবং রাজনীতির ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

২. গণতান্ত্রিক মনোভাব বিকাশ: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিভিন্ন দল, সংগঠন ও গ্রুপের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনি গ্রুপসমূহের মতামত ও স্বার্থও নীতি-নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। গ্রুপতত্ত্ব গণতান্ত্রিক মানসিকতা ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতিকে উৎসাহিত করে।

৩. গ্রুপের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা: গ্রুপতত্ত্বে ব্যক্তির চেয়ে গ্রুপকেই রাজনীতির প্রধান বিশ্লেষণী একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ ব্যক্তি একা রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না; বরং দল বা সংগঠনের মাধ্যমে তার মতামত, দাবি ও স্বার্থ বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। তাই গ্রুপ-স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পায়।

৪. রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুনির্দিষ্টতা: যথাযথ ব্যাখ্যার অভাবে রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। গ্রুপতত্ত্ব গ্রুপের উদ্দেশ্য, কর্মসূচি, নীতি, কৌশল ও কর্মকাঠামো সম্পর্কে স্পষ্ট ও বাস্তবমুখী ব্যাখ্যা প্রদান করে, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অত্যন্ত সহায়ক।

৫. স্বার্থউদ্ঘাটন: একটি গ্রুপে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে। গ্রুপতত্ত্বে গ্রুপের সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয় এবং রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি যারা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে তাদের স্বার্থগুলোকেও বিশ্লেষণ করা হয়। মূলত স্বার্থই মানুষকে রাজনৈতিক গ্রুপে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করে।

৬. রাজনীতির গতিশীলতার সাথে সামঞ্জস্য: মানুষের প্রয়োজন, প্রত্যাশা ও স্বার্থ সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। গ্রুপতত্ত্ব এই পরিবর্তনশীলতার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার গতিশীলতাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে।

৭. তাত্ত্বিক মতের প্রতিফলন: সরকারের নীতি-নির্ধারণে কোন কোন গ্রুপ কীভাবে প্রভাব ফেলে—গ্রুপতত্ত্ব তাতে আলো ফেলে। ফলে রাজনৈতিক তাত্ত্বিকদের মতবাদ ও বিশ্লেষণের বাস্তব প্রতিফলন এ পদ্ধতিতে পরিলক্ষিত হয়।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায় যে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ-পদ্ধতিগুলোর মধ্যে গ্রুপতত্ত্ব অন্যতম। আর্থার বেন্টলির ‘The Process of Government’ (1908) গ্রন্থের মাধ্যমে গ্রুপতত্ত্বের আধুনিক বিকাশ শুরু হয়, যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় বিশ্লেষণে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য হয়েছে। রাষ্ট্রের গ্রুপ-গঠন, গ্রুপ-সংঘাত, নীতিনির্ধারণে গ্রুপের ভূমিকা—সবই গ্রুপতত্ত্বের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায়। আইজাক যথার্থই বলেছেন— “Emphasis on the groups takes us right to the heart of the discipline.”

Post a Comment

أحدث أقدم