ভূমিকা: গ্রুপতত্ত্বের মাধ্যমে বিভিন্ন দিক থেকে একটি গ্রুপের সাথে অন্য গ্রুপের তুলনা করা হয়। একইভাবে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কী ধরনের গ্রুপ বিদ্যমান তা নির্ণয় করে অন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করে উভয়ের উন্নয়নের মাত্রা বিশ্লেষণ করা যায়।
তুলনামূলক রাজনীতি বিশ্লেষণে গ্রুপতত্ত্বের উপাদান
নিম্নোক্ত উপাদানগুলোর সাহায্যে গ্রুপগুলোর তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যায়:
১. গ্রুপের শক্তি: গ্রুপের শক্তির ওপর তার অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নির্ভর করে। গ্রুপের শক্তি নির্ভর করে সদস্য সংখ্যা, সামাজিক মর্যাদা, লক্ষ্য অর্জনে সদস্যদের আন্তরিকতা, অঙ্গসংগঠনের সংখ্যা, নেতৃত্ব, ভৌগোলিক বিস্তৃতি ইত্যাদির ওপর। এসব বিবেচনায় কোন গ্রুপ অন্য গ্রুপের তুলনায় বেশি শক্তিশালী তা নির্ণয় করা যায়।
২. গ্রুপের গঠন প্রক্রিয়া: গ্রুপ হঠাৎ করেও তৈরি হতে পারে, আবার বিবর্তনের মাধ্যমেও গড়ে উঠতে পারে। হঠাৎ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত গ্রুপ উদ্দেশ্য পূরণ হলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বিবর্তনের মাধ্যমে গঠিত গ্রুপ সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তাদের লক্ষ্যও বেশি থাকে। উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গ্রুপগুলো অধিকাংশই বিবর্তনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে।
৩. আকার: গ্রুপের আকার তার শক্তিকে প্রভাবিত করে। সাধারণত বড় আকারের গ্রুপ অধিকতর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। গ্রুপের আকার নির্ভর করে সদস্য সংখ্যা, এলাকার বিস্তৃতি এবং কতসংখ্যক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে তার ওপর।
৪. উদ্দেশ্য সাধনের পদ্ধতি: প্রতিটি গ্রুপের মূল লক্ষ্য থাকে তাদের স্বার্থকে সফল করা। তবে পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক গ্রুপগুলো সাংবিধানিক পদ্ধতিতে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। বামপন্থি গ্রুপ অনেক সময় বিপ্লব বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে লক্ষ্য হাসিলের চেষ্টা করে। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কখনোই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করে না।
৫. নেতৃত্ব: গ্রুপের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যে কোনো গ্রুপের সফলতা, বিকাশ এবং স্থায়িত্ব নির্ভর করে নেতৃত্বের যোগ্যতার ওপর। দুর্বল নেতৃত্বের ক্ষেত্রে গ্রুপে মতভেদ, বিশৃঙ্খলা ও নিয়ন্ত্রণহীনতা দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী সফল গ্রুপগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের সাফল্যের প্রধান কারণ ছিল দক্ষ নেতৃত্ব।
৬. সংহতিবোধ: সংহতিবোধ গ্রুপের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একটি গ্রুপ ছোট হলেও যদি সদস্যদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি দৃঢ় থাকে, তবে গ্রুপটি সফল হয়। বিপরীতে গ্রুপ বড় হলেও সদস্যদের মধ্যে সংহতিবোধ না থাকলে গ্রুপটি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
৭. অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো: গ্রুপের বিধিবদ্ধ নিয়ম অনেক সময় তার বাস্তব অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে মিল থাকে না। কিছু ক্ষেত্রে গ্রুপের প্রভাবশালী নেতা একাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, এমনকি তা বাস্তবায়নও করেন। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
৮. বহুমুখী লক্ষ্য: গ্রুপের অস্তিত্ব অনেকাংশে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে। কোনো গ্রুপের যদি একটি মাত্র লক্ষ্য থাকে, তবে তা পূরণ হলে গ্রুপটি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু বহু লক্ষ্যসম্পন্ন গ্রুপের স্থায়িত্ব বেশি হয়। তাই লক্ষ্য যত বেশি, গ্রুপের টিকে থাকার সম্ভাবনাও তত বেশি।
৯. নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া: গ্রুপের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতিও তুলনামূলক বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সংকটকালে ক্যারিসম্যাটিক নেতৃত্ব সাধারণত গতানুগতিক গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগঠিত গ্রুপকে প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব বা সামরিক নেতৃত্ব দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা হয়। এ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেও গ্রুপগুলোর তুলনা করা হয়।
১০. আন্তঃক্রিয়ার ধরন: প্রতিটি গ্রুপই অন্য গ্রুপের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আন্তঃক্রিয়ায় লিপ্ত থাকে। গ্রুপের কার্যপরিধি অনেকাংশে নির্ভর করে সে কতসংখ্যক গ্রুপের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে তার ওপর। গ্রুপগুলোর মধ্যে সহযোগিতা যেমন শক্তি বৃদ্ধি করে, তেমনি দ্বন্দ্ব-সংঘাত যুদ্ধাবস্থারও সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, রাজনীতি অধ্যয়নের আধুনিক পদ্ধতিগুলোর মধ্যে গ্রুপতত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। গ্রুপের গঠন, বিকাশ, উদ্দেশ্য, শক্তি ও পারস্পরিক সংঘাত—সবকিছুই গ্রুপতত্ত্বের আলোচনায় স্থান পায়। রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বুঝতে গ্রুপতত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্রদান করে।

إرسال تعليق