প্রশ্ন : মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা কার্যকর করার উপায় আলোচনা কর।
ভূমিকা: গ্রেট ব্রিটেনে দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থার মূল অর্থ হলো পার্লামেন্টের কাছে এবং প্রকৃতপক্ষে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ কমন্সসভার কাছে মন্ত্রীদের রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্বশীলতা। মন্ত্রিসভার কার্যকাল সম্পূর্ণভাবে কমন্সসভার আস্থা ও অনাস্থার ওপর নির্ভরশীল। কমন্সসভার আস্থা হারালে মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।
মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা কার্যকর করার উপায়: মন্ত্রিসভাকে নিয়ন্ত্রণ ও দায়িত্বশীল রাখার জন্য কমন্সসভা যেসব পদ্ধতি অবলম্বন করে, তা নিম্নে আলোচনা করা হলো—
১. প্রশ্ন জিজ্ঞাসা: ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তথা কমন্সসভার অধিবেশন চলাকালে যে কোনো সদস্য মন্ত্রীদের নিকট শাসনসংক্রান্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারেন এবং মন্ত্রীরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য। সাধারণত বিরোধী দলের সদস্যরা মন্ত্রীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে এবং সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরতে এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। অতিরিক্ত প্রশ্নের মাধ্যমেও অনেক সময় মন্ত্রীদের বিব্রত করা হয়।
২. নিন্দাসূচক প্রস্তাব: বিরোধী দলের সদস্যরা কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত, নীতি বা সম্পাদিত কাজের বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের সমালোচনা করে নিন্দাসূচক প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার জন্য কমন্সসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়।
৩. অনাস্থা প্রস্তাব: মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতা কার্যকর করার অন্যতম প্রধান উপায় হলো অনাস্থা প্রস্তাব। মন্ত্রিসভার কোনো নির্দিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে অথবা সমগ্র মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা যায়। সাধারণত বিরোধী দলের সদস্যরাই অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হলে মন্ত্রিসভার পতন ঘটে।
৪. পার্লামেন্টারি কমিশনার: কেবিনেটকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে কমন্সসভার পার্লামেন্টারি কমিশনার পদটির গুরুত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৬ সালের পার্লামেন্টারি কমিশনার আইন অনুসারে এ পদটির সৃষ্টি হয়। পার্লামেন্ট সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন। পার্লামেন্টারি কমিশনার এসব অভিযোগের তদন্ত করেন এবং তাঁর বার্ষিক প্রতিবেদন একটি সিলেক্ট কমিটির নিকট পেশ করেন।
৫. ছাঁটাই প্রস্তাব: কমন্সসভা সরকারি বিলের অর্থ মঞ্জুরির কোনো প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে বা তার পরিমাণ হ্রাস করতে পারে। এ ক্ষেত্রে কমন্সসভার সমর্থন না পেলে মন্ত্রিসভাকে হয় পদত্যাগ করতে হয়, নয়তো পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে জনমত যাচাই করতে হয়।
৬. মুলতুবি প্রস্তাব: কমন্সসভা মুলতুবি প্রস্তাবের মাধ্যমে কেবিনেটের কার্যাবলির সমালোচনা করার সুযোগ পায়। এ ধরনের প্রস্তাব মোকাবিলার জন্য কেবিনেটকে দায়িত্বশীলভাবে সরকারি কার্য পরিচালনা করতে হয়।
৭. সাপ্লাই ডিবেট: কমন্সসভায় সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রতিবছর প্রায় ৩০ দিনব্যাপী যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, তাকে সাপ্লাই ডিবেট বলা হয়। এ আলোচনায় বিরোধী দলীয় সদস্যরা সরকারের কার্যাবলি ও গৃহীত নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। এর মাধ্যমে কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ লাভ করে।
৮. দলীয় আনুগত্য: পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমন্সসভার সাধারণ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, সেই দলের অভিজ্ঞ নেতাদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে মন্ত্রিসভা দায়িত্বশীলভাবে সরকারি কার্য পরিচালনায় বাধ্য থাকে।
উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কমন্সসভায় সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে এবং সেই দলের বিশিষ্ট নেতাদের নিয়েই কেবিনেট গঠিত হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কমন্সসভা মন্ত্রিসভাকে নিয়ন্ত্রণ করার পরিবর্তে কেবিনেটই কমন্সসভাকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জেনিংস যথার্থই বলেছেন, “এক অর্থে কমন্সসভাই সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সরকারই কমন্সসভাকে নিয়ন্ত্রণ করে।” তবুও কমন্সসভার কাছে মন্ত্রিসভার দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা বিদ্যমান রয়েছে—এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

إرسال تعليق