ভূমিকা : সাংবিধানিক প্রথা ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এসব প্রথা আইন নয় এবং আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্যও নয়। তা সত্ত্বেও ব্রিটেনে এসব সাংবিধানিক রীতিনীতি কঠোরভাবে মান্য করা হয়। প্রশ্ন ওঠে—আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও কেন এগুলো মান্য করা হয়? এ প্রসঙ্গে ডাইসি বলেন, “সাংবিধানিক রীতিনীতি লঙ্ঘিত হলে দেশের আইন ও আদালতের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হয়; তাই এসব রীতিনীতি মান্য করা হয়।” অন্যদিকে লাওয়েল (Lowell) মনে করেন, সাংবিধানিক রীতিনীতি মূলত ‘সম্মানের বিধিমালা’ (Rules of Morality) হওয়ার কারণেই মান্য করা হয়।
সাংবিধানিক প্রথাসমূহ কেন মান্য করা হয় : ব্রিটেনে সাংবিধানিক রীতিনীতি আইনের সঙ্গে সংঘর্ষের ভয়ে নয়; বরং নানা বাস্তব, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে মান্য করা হয়। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো—
১. জনমতের চাপ: ব্রিটেনে সাংবিধানিক প্রথা মান্য করার প্রধান কারণ হলো জনমতের চাপ। জনগণের প্রবল আনুগত্য ও প্রথা লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত সরকারকে এসব রীতিনীতি মানতে বাধ্য করে। জনগণ প্রত্যাশা করে যে প্রতি বছর পার্লামেন্টের অধিবেশন আহূত হবে এবং কমন্সসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থা হারালে সরকার পদত্যাগ করবে অথবা পুনর্নির্বাচনের ব্যবস্থা নেবে। এ প্রসঙ্গে জিংক (Zink) বলেন, “এই প্রত্যাশাগুলো পূরণ না হলে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে, সেটিই এগুলো পালনের সর্বোত্তম নিশ্চয়তা।”
২. বাস্তব উপযোগিতা: সাংবিধানিক প্রথা লঙ্ঘিত হলে ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। এসব রীতিনীতি সরকারকে সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করে। তাই বাস্তব উপযোগিতার কারণেই এগুলো মান্য করা হয়। ফ্রিম্যান বলেছেন, “সাংবিধানিক রীতিনীতির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না; তাই এগুলো মান্য করা হয়।”
৩. ইংরেজ জাতির রক্ষণশীলতা: ইংরেজ জাতি স্বভাবতই রক্ষণশীল। তারা ঐতিহ্য ও অতীতের গৌরবকে সম্মান করে। ঐতিহ্যমণ্ডিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে একাত্মতা স্থাপনের মাধ্যম হিসেবেই তারা সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলো মান্য করে থাকে।
৪. সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা: যুক্তরাজ্যে অতীত ও আধুনিকতার সমন্বয় সাধনে আইন অপেক্ষা সাংবিধানিক রীতিনীতি অধিক কার্যকর। এসব রীতিনীতি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।
৫. শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা: সাংবিধানিক রীতিনীতি ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করে এবং তাকে সচল রাখে। কার্টার, রেনি ও হার্জ মন্তব্য করেছেন, “এই রীতিনীতিগুলো অমান্য করা হলে শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং সরকারি যন্ত্র সম্পূর্ণভাবে অচল হয়ে যাবে।”
৬. আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা: সাংবিধানিক রীতিনীতি দীর্ঘদিন অমান্য করা হলে তা বিধিবদ্ধ আইনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই আশঙ্কাই সরকারকে রীতিনীতি মানতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০৯ সালে লর্ডসভা কমন্সসভা কর্তৃক গৃহীত রাজস্ব বিল প্রত্যাখ্যান করলে ১৯১১ সালে ‘পার্লামেন্টারি অ্যাক্ট’ প্রণীত হয় এবং লর্ডসভার ক্ষমতা হ্রাস করা হয়।
৭. ক্যাবিনেট শাসনব্যবস্থার অস্তিত্ব রক্ষা: ব্রিটেনে কমন্সসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের নিয়ে ক্যাবিনেট গঠিত হয় এবং ক্যাবিনেটের পরামর্শেই রাজা বা রানী ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। কমন্সসভার আস্থা হারালে ক্যাবিনেটের পতন ঘটে। এসব সাংবিধানিক প্রথা অমান্য করলে ক্যাবিনেট শাসনব্যবস্থার ভিত্তিই ধ্বংস হয়ে যাবে।
৮. রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ: সাংবিধানিক রীতিনীতি অমান্য করলে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া না গেলেও জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়েও রাজনৈতিক নেতারা এসব রীতিনীতি মান্য করেন।
৯. জনসম্মতি: গ্রেট ব্রিটেনে বহু সাংবিধানিক রীতিনীতি দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত। এগুলো জনগণের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সাধারণ মানুষ আইন ও প্রথার মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না; বরং এসব রীতিনীতির প্রতি তাদের নীরব সমর্থন রয়েছে।
১০. আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা: ডাইসির মতে, সাংবিধানিক প্রথা লঙ্ঘন করা পরোক্ষভাবে আইন লঙ্ঘনের শামিল। কারণ প্রথা অনুসারে প্রতি বছর পার্লামেন্ট অধিবেশন বসে, রাজস্ব আদায় হয় এবং সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যয় অনুমোদিত হয়। প্রথা ভঙ্গ হলে এসব কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হবে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনে সাংবিধানিক প্রথা মান্য করার একটি সুদীর্ঘ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল—উভয়েই এসব রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যদিও এসব প্রথা অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে, তথাপি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে ভবিষ্যতে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সাংবিধানিক প্রথার প্রকৃতি ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে—এ সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

إرسال تعليق