ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধানসমূহের ভূমিকা ও গুরুত্ব কি?


প্রশ্ন : ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধানসমূহের ভূমিকা ও গুরুত্ব আলোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উৎস হলো প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি। বস্তুত এসব রীতিনীতির ওপরই ইংরেজ জাতির শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। এ কারণে এডমন্ড বার্ক (Edmund Burke) বলেছেন, “Convention is the motive power of the British Constitution.” ব্রিটেনের অলিখিত শাসনতন্ত্রের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো বিস্তৃত। অধ্যাপক এ. ভি. ডাইসি সর্বপ্রথম ‘শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি’ (Conventions) শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে তাঁর পূর্বে জে. এস. মিল এগুলোকে ‘শাসনতন্ত্রের অলিখিত বিধি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এককথায়, ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতির ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রথাগত বিধানের ভূমিকা বা গুরুত্ব : ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধানের ভূমিকা ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। প্রথাগত বিধান ব্যতীত এখানে আইনের অনুশাসনের কার্যকর প্রয়োগ কল্পনা করা কঠিন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক জেনিংস বলেছেন, “ব্রিটেনের সংবিধানে প্রথাগত বিধানসমূহ আইনের শুষ্ক অস্থিতে মাংসের প্রলেপ সৃষ্টি করে।” নিম্নে প্রথাগত বিধানের ভূমিকা ও গুরুত্ব আলোচনা করা হলো—

১. সংবিধানের প্রধান চালিকাশক্তি: ব্রিটেনের সংবিধানের প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রথাগত বিধান। আইনের বিভিন্ন বিধান কীভাবে কার্যকর হবে, তা মূলত প্রথার মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়। ফলে শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রথাগত বিধানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে জেনিংস বলেছেন, “They determine the manner in which the rules of law which they presuppose are applied, so that they are in fact the motive power of the constitution.”

২. আইনের ফাঁক পূরণ: প্রথাগত বিধান আইনের ফাঁক পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রক্ত-মাংস ব্যতীত মানবদেহ যেমন কঙ্কালে পরিণত হয়, তেমনি প্রথাগত বিধান বা সাংবিধানিক রীতিনীতি ব্যতীত আইনের কাঠামোও পূর্ণতা ও গতিশীলতা লাভ করে না। এ প্রসঙ্গে হার্ভে ও বেদার বলেছেন, “They help the machinery to run smoothly.”

৩. সরকারি ক্ষেত্রে সহযোগিতা সৃষ্টি: সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনার জন্য সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতি বিশেষ ভূমিকা পালন করে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটেনের ক্যাবিনেট-সংক্রান্ত রীতিনীতির কথা উল্লেখ করা যায়। তদুপরি, পার্লামেন্ট সংক্রান্ত রীতিনীতিগুলো সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

৪. কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ: যদিও সাংবিধানিক রীতিনীতিগুলো আইনরূপে গণ্য নয় এবং আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য নয়, তথাপি এগুলো আইনের অলিখিত অংশ হিসেবে শাসনক্ষমতাধারীদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৫. জনমতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা: প্রথাগত বিধান জনগণের ইচ্ছাকে বাস্তব রূপ দিতে সহায়তা করে। কমন্সসভার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। যেমন—ক্যাবিনেট ও পার্লামেন্ট সম্পর্কিত রীতিনীতির মাধ্যমে জনমতের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

৬. শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা: প্রথাগত বিধান ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষা করে। এসব রীতিনীতি অমান্য করা হলে শাসনব্যবস্থায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তাই সরকার ও জনগণ উভয়েই প্রথাগত বিধান মেনে চলে।

৭. ঐতিহ্য সংরক্ষণ: ব্রিটিশ জাতি স্বভাবতই রক্ষণশীল এবং তারা ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রথাগত বিধান বা শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো ব্রিটিশ ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্বার্থে এসব প্রথার গুরুত্ব স্বীকৃত।

৮. বিপ্লবের সম্ভাবনা হ্রাস: শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো ব্রিটেনে একটি সুপরিবর্তনীয় শাসন কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ প্রসঙ্গে জেনিংস মন্তব্য করেন, “পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে শাসনতান্ত্রিক রীতিনীতিগুলো যুক্তরাজ্যকে রক্তক্ষয়ী বিপ্লব থেকে রক্ষা করেছে।”

৯. রাজা বা রানীর ঐচ্ছিক ক্ষমতার ব্যবহার: ব্রিটেনের রাজা বা রানী প্রথার মাধ্যমেই তাদের ঐচ্ছিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। উদাহরণস্বরূপ, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে কমন্সসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে নিয়োগ দেওয়া এবং অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রথার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১০. গণতন্ত্রের বিকাশ: ব্রিটেনে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিকাশে প্রথাগত বিধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে রাজা বা রানীর নিকট থেকে জনগণের হাতে ন্যস্ত হওয়ার পেছনে প্রথাগত বিধানই প্রধান ভূমিকা রেখেছে।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় প্রথাগত বিধান বা সাংবিধানিক রীতিনীতির ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিহার্য। এগুলো ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচিত। যদিও এসব রীতিনীতি পরিবর্তনের গতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে, তথাপি তা রাজনৈতিক বিকাশের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। এ প্রসঙ্গে ফ্রিম্যান (Freeman) যথার্থই বলেছেন, “Conventions are in practice held hardly less sacred than any principle embodied in the Magna Carta or the Petition of Right.”

Post a Comment

أحدث أقدم