ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের কারণ আলোচনা কর


প্রশ্নঃ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের কারণ আলোচনা কর।

ভূমিকা : পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্বকে ব্রিটিশ শাসনতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভরূপে গণ্য করা হয়। প্রাচীনত্ব, ক্ষমতার পরিধি, প্রয়োগক্ষেত্রের ব্যাপ্তি প্রভৃতি দিক থেকে বিচার করলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পৃথিবীতে অনন্য। ব্রিটেনের সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর পার্লামেন্টের নিরঙ্কুশ আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও বাস্তবে এর ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। কেননা বর্তমানে পার্লামেন্ট নয়, ক্যাবিনেটই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের কারণ : তাত্ত্বিকভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট চরম ও অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হলেও বাস্তবে তার সে ক্ষমতা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। নিম্নে পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের কারণগুলো আলোচনা করা হলো—

১. দলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব : পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাসের প্রধান কারণ হলো দলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব। দলীয় সংহতি ও ঐক্যের ফলে যে কোনো আইনের প্রস্তাব কমন্সসভায় সহজেই পাস হয়ে যায়। কারণ কমন্সসভায় ক্ষমতাসীন দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিদ্যমান থাকে।

২. কৌশলগত জ্ঞানের অভাব : বর্তমানকালে প্রযুক্তিবিদ্যার উৎকর্ষের ফলে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা ছাড়া আইন প্রণয়ন সম্ভব নয়। অধিকাংশ পার্লামেন্ট সদস্য আধুনিক কারিগরি জ্ঞানে অদক্ষ। সুতরাং তারা জটিল বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ মহলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এতে পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস পায়।

৩. প্রধানমন্ত্রীর কমন্সসভা ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা : ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রভূত ক্ষমতার নিকট পার্লামেন্ট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। পার্লামেন্ট বা কমন্সসভা যদি ক্যাবিনেটের কোনো প্রস্তাব অস্বীকার করে, তবে প্রধানমন্ত্রী কমন্সসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য রাজা বা রানীকে পরামর্শ দিতে পারেন। তাছাড়া কমন্সসভার শাসক দলের মধ্যে সরকারি নীতি সম্পর্কে গুরুতর মতপার্থক্য দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রী কমন্সসভা ভেঙে দেওয়ার ভীতি প্রদর্শন করতে পারেন।

৪. ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব : ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব পার্লামেন্টের ক্ষমতাকে হ্রাস করেছে। এ প্রসঙ্গে Ramsay Muir বলেছেন, “ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে পার্লামেন্টের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে হ্রাস করেছে। এটি পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছে। তাই পার্লামেন্ট কেবল একটি চরম ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যাবিনেটকে সমর্থন করার জন্য টিকে আছে।”

৫. প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থা : বর্তমানে বিভিন্ন দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা বিভাগীয় বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কিছু বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ক্যাবিনেট মন্ত্রীদের হাতে বিচারসংক্রান্ত এসব ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ার ফলে পার্লামেন্টের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাস পেয়েছে।

৬. আমলাতন্ত্রের প্রসার : সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার গঠনপূর্ব পার্লামেন্টের সাধারণ সদস্যগণের পক্ষে সরকারের সকল কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সদস্যদের অধিকাংশই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ায় তারা কারিগরি জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না। ফলে আমলারা তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের আলোকে সরকারি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

৭. কমন্সসভার অক্ষমতা : সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় পার্লামেন্টের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ফলে তার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। কমন্সসভার অক্ষমতাগুলো হলো—

ক. ব্রিটেনের কমন্সসভা বৃহদাকার হওয়ায় ক্যাবিনেটকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি।

খ. বছরে একবার অথবা দু’বার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কমন্সসভার অধিবেশন বসে। এ স্বল্প সময়ের মধ্যে কমন্সসভা তার সকল দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পাদন করতে পারে না।

গ. তথ্য সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে কমন্সসভার ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়েছে।

৮. নির্বাচকমণ্ডলীর ক্ষমতা : প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সর্বজনীন ভোটাধিকারের নীতি কার্যকর হওয়ায় সরকার গঠন ও সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নির্বাচকমণ্ডলীর ক্ষমতা ও মর্যাদাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেও পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

৯. পার্লামেন্টের কর্মধারা নিয়ন্ত্রণ : ক্যাবিনেট কর্তৃক পার্লামেন্টের কর্মধারা নিয়ন্ত্রণের ফলে পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান ও স্থগিত করা, রাজা বা রানীর ভাষণের বিষয়বস্তু নির্ধারণ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে কমন্সসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য রাজা বা রানীকে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্যাবিনেটই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

১০. আদালতের নিয়ন্ত্রণ : ব্রিটেনের সর্বোচ্চ আদালত পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রণীত আইন বাতিল করতে না পারলেও আইনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের অধিকার রাখে। আইন ব্যাখ্যার এ অধিকারের মাধ্যমে আদালত আংশিকভাবে হলেও পার্লামেন্টের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।

১১. স্বার্থকামী গোষ্ঠীর উদ্ভব : পার্লামেন্টের উভয় কক্ষই শাসন বিভাগকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বিভিন্ন স্বার্থকামী গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটেছে। পার্লামেন্টের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এসব গোষ্ঠীর প্রতি অধিক গুরুত্ব প্রদান করে, যা পার্লামেন্টের ক্ষমতার দুর্বলতা প্রকাশ করে।

১২. অর্পিত ক্ষমতা-প্রসূত আইন : ব্রিটেনে জরুরি অবস্থায় শাসন বিভাগকে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগের বিধান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জরুরি অবস্থা শেষ হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে এসব ক্ষমতার কার্যকারিতা বজায় থাকে, যা পার্লামেন্টের স্বাধীন ক্ষমতার প্রতি হুমকিস্বরূপ বলে বিবেচিত হয়।

১৩. জনমনস্তত্ত্ব : অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন জনসাধারণকে শাসন বিভাগের ওপর অধিক নির্ভরশীল করে তুলেছে। তারা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, পার্লামেন্টে যত বিতর্ক ও আলোচনা হোক না কেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ক্যাবিনেটই। এ ধরনের জনমনস্তত্ত্ব শাসন বিভাগকে শক্তিশালী এবং আইন বিভাগকে তুলনামূলকভাবে দুর্বল করেছে।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বিভিন্ন কারণে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে এবং ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে তাই বলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়নি। আইন প্রণয়নসংক্রান্ত মৌলিক কাজগুলো এখনো পার্লামেন্টই সম্পাদন করে থাকে। সুতরাং ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থায় পার্লামেন্টের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন