ব্রিটেনের পার্লামেন্ট কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে—আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের পার্লামেন্ট কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে—আলোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটেনের আইনসভার উচ্চকক্ষের নাম লর্ডসভা এবং নিম্নকক্ষের নাম কমন্সসভা। তবে বর্তমানে লর্ডসভা অনেকটা নির্জীব অবস্থায় রয়েছে, আর কমন্সসভা রয়েছে সজীব। ব্রিটেনে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলিত থাকায় মন্ত্রিসভা ও পার্লামেন্টের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এ অবস্থায় অনেক সময় পার্লামেন্ট মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার অনেক সময় মন্ত্রিপরিষদ পার্লামেন্টকে নিয়ন্ত্রণ করে।

পার্লামেন্ট কীভাবে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে : ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সার্বভৌমত্ব ব্রিটিশ সংবিধানের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাই সাংবিধানিকভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

১. আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত ক্ষমতা : ব্রিটিশ পার্লামেন্টই সর্বোচ্চ আইন প্রণয়ন ক্ষমতার অধিকারী। এর ক্ষমতা আইনত অবাধ ও সীমাহীন। ব্ল্যাকস্টোন বলেছেন, “পার্থিব জগতে এমন কোনো শক্তি নেই, যা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতা অস্বীকার করতে পারে।” ফরাসি লেখক ডি লোম (De Lolme) তাই রসিকতা করে বলেছেন, “It can do everything except making a man a woman and a woman a man.” সুতরাং ব্রিটিশ পার্লামেন্ট যে কোনো আইন প্রণয়ন করে মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

২. প্রশ্ন জিজ্ঞাসা : কমন্সসভার যে কোনো সদস্য শাসন-সংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রীদের প্রশ্ন করতে পারেন। সাধারণত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব প্রদান করে থাকেন। প্রশ্নোত্তরকালে কোনো মন্ত্রী মিথ্যার আশ্রয় নিলে তা প্রকাশ পেয়ে যায়। বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলকে অসুবিধায় ফেলার জন্য এ ধরনের প্রশ্ন করে থাকেন। ফলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও দলের জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন হয়। প্রশ্ন জিজ্ঞাসার জন্য অন্তত দুই দিন আগে নোটিশ প্রদান করতে হয়। এজন্য মন্ত্রিগণ তাদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকেন। এভাবে কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৩. নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে : সরকারের কোনো বিশেষ নীতি বা কার্যকলাপের জন্য কমন্সসভা মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। তাছাড়া বিরোধী দলের সদস্যরা কতকগুলো জরুরি বিষয়ে বিতর্কের জন্য সভার সময় বরাদ্দের আহ্বান জানাতে পারে। সরকার সময়ের স্বল্পতার কারণে নিজস্ব বিল পাসে ব্যস্ত থাকায় অনেক সময় বিরোধী দলের প্রস্তাবে সাড়া দিতে চায় না। এরূপ পরিস্থিতিতে বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে নিন্দাসূচক প্রস্তাব বা অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারে। এর মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়।

৪. মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ : কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার জন্য যথাযথ নোটিশ প্রদানের পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর জবাবে প্রশ্নকারী সন্তুষ্ট না হলে কমন্সসভা উক্ত বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন করতে পারে। স্পিকার অনুমতি প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে প্রায় আধঘণ্টা বিতর্কের সুযোগ দেওয়া হয়। এভাবে মুলতবি প্রস্তাবের মাধ্যমে পার্লামেন্ট মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৫. বিতর্ক অনুষ্ঠান : কমন্সসভার প্রথম অধিবেশনে রাজা বা রানীকে অভিভাষণ প্রদান করতে হয়। রাজা বা রানী নিজে কিংবা তাঁর পক্ষে লর্ড চ্যান্সেলর এ অভিভাষণ পাঠ করেন। এ অভিভাষণ মূলত ক্যাবিনেট কর্তৃক প্রণীত হয়। অভিভাষণ পাঠ আপাতদৃষ্টিতে আনুষ্ঠানিক বিষয় বলে মনে হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ এর মধ্যেই সরকারের প্রধান প্রধান নীতি ও কর্মসূচির ঘোষণা থাকে। উক্ত ভাষণের পরদিন ধন্যবাদ জ্ঞাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এতে বিরোধী দল সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ পায়। মূলত এর মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৬. সিলেক্ট কমিটি গঠন : সিলেক্ট কমিটির মাধ্যমে সরকারি কাজকর্ম ও নীতি সম্পর্কে তদন্ত কার্য পরিচালনা করা যায়। সাধারণত অনধিক ১৫ জন সদস্য নিয়ে প্রতিটি সিলেক্ট কমিটি গঠিত হয় এবং প্রতিটি কমিটি নিজেদের সভাপতি নিজেরাই নির্বাচন করে। কাজের সুবিধার্থে কোনো সিলেক্ট কমিটি উপ-কমিটিও গঠন করতে পারে। ব্রিটিশ কমন্সসভার সিলেক্ট কমিটি সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে। যথা— (ক) অস্থায়ী কমিটি, (খ) বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং (গ) অধিবেশনকালীন কমিটি। এর মাধ্যমেও পার্লামেন্টের কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।

৭. অনাস্থা প্রস্তাব : বিরোধী দলভুক্ত সদস্যরা সরকারকে অসুবিধায় ফেলার জন্য এবং নিজ দলের সপক্ষে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কোনো একজন বিশেষ মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কিংবা সমগ্র সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা যেতে পারে। এরূপ প্রস্তাব গৃহীত হলে মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হয়। কাজেই মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র হলো কমন্সসভায় অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন।

৮. জনমত গঠন : ব্রিটিশ পার্লামেন্ট জনমত গঠনের মাধ্যমেও মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কমন্সসভা সরকারি নীতি ও কাজকর্মের ওপর সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখে। সরকারের জনস্বার্থবিরোধী কাজ ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলে। সুতরাং জনমত গঠনের মাধ্যমেও কমন্সসভা মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

৯. জরুরি মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন : স্পিকারের অনুমতি সাপেক্ষে পার্লামেন্ট কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য জরুরি মুলতবি প্রস্তাব আনয়ন করতে পারে। এ বিষয়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত পার্লামেন্টে আলোচনা হয়। এ আলোচনা সাধারণত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উত্তেজনাপূর্ণ হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রতি আস্থা বা অনাস্থার বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িত থাকে।

১০. ছাঁটাই প্রস্তাব : কমন্সসভা মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতা কার্যকর করার জন্য সরকারের কোনো বিল বা ব্যয় মঞ্জুরির প্রস্তাব ছাঁটাই করতে পারে। এমতাবস্থায় মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করতে পারে কিংবা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দিতে পারে। অবশ্য এ কাজটি রাজা বা রানী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে করে থাকেন।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, উল্লিখিত পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে সুসংহত দলীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন, প্রধানমন্ত্রীর পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা, নির্বাচনী এলাকার বিস্তৃতি প্রভৃতি কারণে পার্লামেন্ট সব সময় মন্ত্রিসভাকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বার্চ বলেছেন, “পার্লামেন্টের নিকট মন্ত্রীদের দায়িত্বশীলতার গুরুত্ব তাত্ত্বিকভাবে অসীম হলেও ইংল্যান্ডে সুশৃঙ্খল ও সুসংহত দলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার ফলে সে গুরুত্ব বর্তমানে যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে।”

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন