প্রশ্ন: কমন্সসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা কর।
ভূমিকা : ব্রিটিশ পার্লামেন্টের দুটি কক্ষের মধ্যে কমন্সসভা সবচেয়ে বেশি ক্ষমতার অধিকারী এবং এর কার্যাবলিও সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট বলতে সাধারণভাবে কমন্সসভাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। কারণ রাজা বা রানীর ভূমিকা আনুষ্ঠানিক মাত্র এবং লর্ডসভা কমন্সসভার কাজে কিছু বিলম্ব ঘটাতে পারে মাত্র। তাই Prof. Finer মন্তব্য করেছেন, "Almost all the authority of Parliament is in the House of Commons; the House of Lords is but a feeble delayer."
কমন্সসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি : ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় কমন্সসভার গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্নে কমন্সসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি আলোচনা করা হলো :
১. আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত ক্ষমতা : তাত্ত্বিকভাবে বলতে গেলে কমন্সসভা মূলত একটি আইন প্রণয়নকারী সংস্থা। সকল প্রধান আইনের বিল প্রথমে কমন্সসভায় উত্থাপন করা হয়। কমন্সসভায় উপস্থিত সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের দ্বারা গৃহীত না হলে কোনো বিল আইনে পরিণত হতে পারে না। কমন্সসভার গৃহীত বিল লর্ডসভা বাতিল করতে পারে না। এমনকি রাজা বা রানীও সাধারণত অসম্মতি জ্ঞাপন করেন না। মূলত আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কমন্সসভাই সর্বেসর্বা। এজন্য অধ্যাপক মনরো বলেছেন, "The House of Commons has supremacy in lawmaking; it controls the finances of the realm, fixes the jurisdiction of the courts and dominates the action of the Crown."
২. নির্বাচন-সংক্রান্ত ক্ষমতা : ব্রিটিশ কমন্সসভার প্রথম কাজ হলো সদস্যদের মধ্য হতে একজনকে স্পিকার বা কমন্সসভার সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা।
৩. সরকার গঠন : প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর কমন্সসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে রাজা বা রানী প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন। তারপর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে তিনি অন্য মন্ত্রীদের নিয়োগদান করেন। বিদ্যমান রীতিনীতি অনুসারে প্রধানমন্ত্রী কমন্সসভার সদস্য হবেন। কমন্সসভার আস্থা হারালে সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। তাই বলা যায় যে, কমন্সসভাই সরকার গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
৪. শাসন বিভাগের তদারকি : কমন্সসভা দেশের শাসনব্যবস্থা তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কমন্সসভা শুধু সরকার গঠন ও সমর্থন করে না, বরং সরকারের কাজকর্মের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে এর সমালোচনাও করে থাকে। কমন্সসভার সদস্যরা মন্ত্রীদের স্ব-স্ব দপ্তরের প্রশ্নোত্তরকালে সরকারের কোনো দোষত্রুটি ধরা পড়লে তার প্রতিবিধানকল্পে প্রয়োজনবোধে কমিশন বা কমিটি গঠন করতে পারে।
৫. সরকারকে নিয়ন্ত্রণ : ব্রিটেনের সংসদীয় শাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক নীতি হলো কমন্সসভার নিকট মন্ত্রিপরিষদের দায়িত্বশীলতা। সম্পাদিত কার্যাবলির জন্য মন্ত্রিগণকে ব্যক্তিগতভাবে এবং যৌথভাবে কমন্সসভার নিকট দায়ী থাকতে হয়। তাই কমন্সসভার আস্থা হারালে মন্ত্রিপরিষদকে পদত্যাগ করতে হয়। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা, বিতর্ক অনুষ্ঠান, নিন্দাসূচক প্রস্তাব উত্থাপন এবং অন্যান্য প্রস্তাব আনয়নের মাধ্যমে কমন্সসভা মন্ত্রিসভাকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বর্তমানে ক্যাবিনেটের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় মন্ত্রিসভার ওপর কমন্সসভার নিয়ন্ত্রণ অনেক কমে গেছে।
৬. অর্থবিল-সংক্রান্ত ক্ষমতা : অর্থবিল উত্থাপন ও পাস করার ক্ষেত্রে কমন্সসভা প্রাধান্য বিস্তার করে। অর্থবিল প্রথমে কমন্সসভায় উত্থাপিত হয়। কমন্সসভা কর্তৃক অর্থবিল গৃহীত হওয়ার পর ওই বিল লর্ডসভার অনুমোদনের জন্য প্রেরিত হয়। তবে লর্ডসভা কোনো অর্থবিল প্রত্যাখ্যান করতে পারে না।
৭. সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা : ব্রিটেনের সংবিধান অত্যন্ত নমনীয়। কমন্সসভার উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের সমর্থনে যেভাবে কোনো সাধারণ বিল অনুমোদিত হয়, সেভাবেই সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তন করা যায়।
৮. সরকারি আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ : কমন্সসভার একটি উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব হলো সরকারি আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। প্রত্যেক আর্থিক বছরের শেষে রাজা বা রানীর পূর্বানুমতি নিয়ে অর্থমন্ত্রী কমন্সসভায় পরবর্তী আর্থিক বছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্পর্কে প্রস্তাব পেশ করেন। এ প্রস্তাব বাজেট প্রস্তাব নামে পরিচিত।
৯. রাজনৈতিক শিক্ষাদান : পার্লামেন্টের সদস্যগণ রাজনৈতিক বিষয়ে বিতর্কে অংশ নেন এবং অভিজ্ঞ সাংসদদের বক্তব্য শোনেন। এতে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। পরবর্তীতে এরাই মন্ত্রী হন এবং দেশ পরিচালনা করেন।
১০. জনমত গঠন : কমন্সসভার বিতর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও হিতকর। কমন্সসভায় বিরোধী দল সরকারের ব্যর্থতা ও বিভিন্ন ত্রুটিগুলো নিয়ে বক্তৃতা করে। এসব সংবাদপত্রের মাধ্যমে জনগণের কাছে প্রচারিত হয়। অপরদিকে, সরকারি দলও সমালোচনার মুখে তাদের নীতির সপক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করে। এগুলো জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, কমন্সসভার ক্ষমতা ও কার্যাবলি অত্যন্ত ব্যাপক। প্রতিনিধিমূলক কক্ষরূপে কমন্সসভার হাতে সকল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। কমন্সসভাই ব্রিটেনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিতর্কের মঞ্চ এবং সকল ক্ষমতার উৎস। সর্বোপরি বলা যায়, কমন্সসভাতেই সমগ্র জাতির কর্মদক্ষতার ছবি ফুটে ওঠে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন