লর্ডসভার গঠন আলোচনা কর


প্রশ্ন: লর্ডসভার গঠন আলোচনা কর।

ভূমিকা : উত্তরাধিকারসূত্রে গঠিত লর্ডসভার সদস্যগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না। অর্থাৎ এখানে পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্রই পরবর্তী লর্ড হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লর্ডসভার সদস্যসংখ্যা স্থায়ী নয়। ১৯৭৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত এর সদস্যসংখ্যা ১১০০ জন থাকলেও ১৯৮৭ সালের মাঝামাঝি তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮৭ জন।

লর্ডসভার গঠন : লর্ডসভার গঠন নিম্নে আলোচনা করা হলো :

১. পিয়ার ব্যবস্থা : ব্রিটেনের সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রয়োজনেই সামন্তযুগে পিয়ার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। চতুর্দশ শতাব্দীতে পিয়ার বা উত্তরাধিকারসূত্রে সদস্যপদ প্রাপকদের প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং রাজা বা রানী পার্লামেন্ট অধিবেশনে আসন গ্রহণের জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনেক ব্যারনকে পিয়ার হিসেবে নিয়োগ করতে পারেন। ব্রিটিশ লর্ডসভার লর্ডগণ মূলত পাঁচ ভাগে বিভক্ত। যথা—

১. ডিউক (Duke)
২. মার্কুইস (Marquess)
৩. আর্ল (Earl)
৪. ভিসকাউন্ট (Viscount)
৫. ব্যারন (Baron)

২. উত্তরাধিকারসূত্রে লর্ডসভার সদস্যপদ : লর্ডসভার সদস্যগণ উত্তরাধিকারসূত্রে লর্ড উপাধি প্রাপ্ত হওয়ায় তারা কমন্সসভার সদস্যপদ লাভের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। তবে ১৯৬৩ সালের ‘পিয়ারেজ আইন’-এর আগে বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের উদ্ভব হয়। অ্যান্টনি ওয়েজউড বেন উত্তরাধিকারসূত্রে লর্ড উপাধি প্রাপ্ত হয়েও লর্ডসভার সদস্যপদ ত্যাগ করে কমন্সসভার সদস্যপদ লাভের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং জয়লাভ করেন। কিন্তু তার এই জয়লাভের বিরুদ্ধে বৈধতার প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি আদালতে পাঠানো হয়। নির্বাচনী আদালত রায় দেয় যে, স্বেচ্ছায় কোনো ব্যক্তি লর্ড উপাধি ত্যাগ করতে পারবেন না এবং কমন্সসভার সদস্যও হতে পারবেন না।

৩. ১৯৬৩ সালের পিয়ারেজ আইন : ১৯৬৩ সালে লর্ডসভার সংস্কার-সংক্রান্ত যুগ্ম কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ‘পিয়ারেজ আইন’ পাস করা হয়। এ আইনে উল্লেখ করা হয় যে, উত্তরাধিকারসূত্রে লর্ড উপাধি প্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় এক বছরের মধ্যে লর্ড উপাধি ত্যাগ করে কমন্সসভার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ আইনের ফলে সকল বিতর্কের অবসান ঘটে।

৪. স্কটল্যান্ডের লর্ড : ১৭০৭ সালে স্কটল্যান্ডের সাথে ইংল্যান্ডের ‘একত্রীকরণ আইন’ প্রণীত হলে পার্লামেন্টে স্কটল্যান্ডের লর্ডগণ নিজেদের মধ্য থেকে ১৬ জনকে লর্ডসভায় নির্বাচিত করার অধিকার লাভ করেন। তবে পিয়ারেজ আইন পাস হওয়ার পর উত্তরাধিকারসূত্রে উপাধিপ্রাপ্ত স্কটিশ লর্ডগণ সকলেই লর্ডসভার সদস্য হিসেবে যোগদানের অনুমতি লাভ করেন।

৫. আয়ারল্যান্ডের লর্ড : ১৯২২ সালে স্বাধীন আইরিশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার ফলে ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণ আইন কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে এর পূর্বে আইরিশ পিয়াররা নিজেদের মধ্য থেকে ২৮ জনকে লর্ডসভার সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করতে পারতেন।

৬. ধর্মীয় লর্ড : ক্যান্টারবেরি ও ইয়র্কের আর্চবিশপ, লন্ডন, ডারহাম ও উইনচেস্টারের বিশপগণ এবং চার্চ অব ইংল্যান্ডের ২১ জন জ্যেষ্ঠ বিশপ ক্রমান্বয়ে লর্ডসভার সদস্যপদ লাভ করেন। তারা যতদিন বিশপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, ততদিন লর্ডসভার সদস্য থাকতে পারেন। এদেরকে ধর্মীয় লর্ড বলা হয়। বর্তমানে ব্রিটেনের লর্ডসভায় মোট ২৬ জন ধর্মীয় লর্ড রয়েছেন।

৭. আপিল লর্ড : ১৮৭৬ সালে আপিল এখতিয়ার আইন (Appellate Jurisdiction Act) প্রণীত হলে ব্যারন উপাধিধারীদের মধ্য থেকে কয়েকজন আপিল লর্ড বা ল’ লর্ড লর্ডসভায় নিযুক্ত হওয়ার অধিকার লাভ করেন। এ সকল লর্ড লর্ডসভার বিচারকার্য সম্পাদন করে থাকেন। বর্তমানে ব্রিটেনের লর্ডসভায় ৯ জন আপিল লর্ড রয়েছেন।

৮. আজীবন পিয়ার : ১৯৫৮ সালে ‘আজীবন পিয়ারেজ আইন’ প্রণীত হয়। এ আইন অনুসারে রাজা বা রানী তার জন্মদিন, নববর্ষ প্রভৃতি অনুষ্ঠান উপলক্ষে শিল্প, সাহিত্য, চারুকলা, বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আজীবন পিয়ার পদে যোগদানের জন্য আহ্বান জানাতে পারেন। তবে এ সদস্যপদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়। লর্ডসভায় আজীবন পিয়ারের সংখ্যা বর্তমানে ২৩৫ জন।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনের লর্ডসভা প্রধানত উত্তরাধিকারসূত্রে গঠিত। এ কক্ষের কোনো সদস্যই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনসাধারণের দ্বারা নির্বাচিত নন। এর অধিকাংশ সদস্যই জন্মগত সূত্রে আসন অধিকার করেন।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন