ভূমিকা : আধুনিক রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন পদ্ধতির সঙ্গে কমিটি ব্যবস্থা (Committee System) অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেননা প্রত্যেক দেশেই আইনসভার অধিকাংশ কার্যক্রম বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তথা কমন্সসভাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। সাধারণত কমন্সসভার যেকোনো বিলের দ্বিতীয় পাঠের পর, অর্থাৎ বিলটির মূলনীতি সম্পর্কে কমন্সসভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অব্যবহিত পরই বিলটি বিশদ বিবেচনার জন্য কমিটির নিকট প্রেরণ করা হয়। কাজেই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কমিটি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কমিটি ব্যবস্থা : বর্তমানে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাঁচ ধরনের কমিটি ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে এগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো—
১. সমগ্র কক্ষ কমিটি (Committee of the Whole House) : সমগ্র কমন্সসভা যখন একটি কমিটি হিসেবে কাজ করে, তখন তাকে সমগ্র কক্ষ কমিটি বলা হয়। কমন্সসভার সকল সদস্যকে নিয়ে এ কমিটি গঠিত হয়। যেকোনো বিল এ কমিটিতে পাঠানো যায়। তবে সাধারণত অর্থবিল বা বিশেষ প্রয়োজনে উত্থাপিত বিল বিচার-বিবেচনার জন্য এ কমিটিতে পাঠানো হয়। স্পিকার এ কমিটিতে সভাপতিত্ব করেন না। তবে স্পিকারের ক্ষমতার প্রতীক দণ্ডটি টেবিলের নিচে রাখা হয়। ব্রিটেনে কমন্সসভা বা পার্লামেন্টের কমিটিসমূহের মধ্যে সমগ্র কক্ষ কমিটি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য হয়।
২. স্থায়ী কমিটি (Standing Committee) : কমন্সসভার স্থায়ী কমিটিগুলো পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ার পর প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই গঠিত হয় এবং অধিবেশন সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকে। বর্তমানে কমন্সসভায় স্থায়ী কমিটির সংখ্যা মোট চারটি এবং সবগুলোই আয়তনে বৃহৎ। প্রত্যেকটি কমিটির সদস্যসংখ্যা ২০ জন। তবে কোনো বিশেষ বিলের বিবেচনার সময় বাছাই কমিটি ইচ্ছা করলে আরও কিছু অতিরিক্ত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এ স্থায়ী কমিটিগুলো কোনো বিশেষ বিলের বিবেচনার জন্য গঠিত হয় না; স্পিকার বিভিন্ন বিল প্রয়োজনমতো এসব কমিটিতে প্রেরণ করেন। প্রত্যেকটি বিল সম্পর্কে কমিটিকে পার্লামেন্টে প্রতিবেদন প্রদান করতে হয়। এ স্থায়ী কমিটিগুলো A, B, C ও স্কটিশ কমিটি নামে পরিচিত।
৩. বাছাই কমিটি (Select Committee) : কমন্সসভায় কতকগুলো বাছাই বা সিলেক্ট কমিটিও রয়েছে। সাধারণত ১৫ জন সদস্য নিয়ে এ কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটির সদস্যরাও কমন্সসভার অধিবেশনের শুরুতে মনোনয়ন কমিটির মাধ্যমে নিযুক্ত হন। প্রতিটি কমিটি নিজেদের সভাপতি নির্বাচন করে। বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা যাতে কমিটিগুলোতে স্থান পান, সেদিকে লক্ষ্য রাখা হয়। কোনো বিল পর্যালোচনা বা কোনো বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য বিলটি সিলেক্ট কমিটির নিকট পাঠানো হয়। কমিটি তথ্য সংগ্রহ করে, সাক্ষ্য গ্রহণ করে এবং সকল দলিলপত্রসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমন্সসভার নিকট পেশ করে।
৪. উভয় কক্ষের যৌথ কমিটি (Joint Committees of Both Houses) : লর্ডসভা ও কমন্সসভার সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে পার্লামেন্টের যৌথ কমিটি গঠিত হয়। যৌথ কমিটি আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট হয়। এর সদস্যসংখ্যা ১৪ জন। সাধারণত একজন পিয়ারকে এ কমিটির সভাপতি করা হয়। আইন কমিশনের সুপারিশক্রমে সাধারণত লর্ড চ্যান্সেলর এ ধরনের বিল পার্লামেন্টের নিকট পেশ করেন।
৫. বেসরকারি বিল-সংক্রান্ত কমিটি (Private Bills Committee) : বেসরকারি বিল বিচার-বিবেচনার জন্য বেসরকারি বিল কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির সদস্যদের মনোনয়ন কমিটি নির্বাচন করে। বেসরকারি বিল কমিটি দুই ধরনের হতে পারে। যথা—
বিতর্কিত বিলের জন্য কমিটি।
অবিতর্কিত বিলের জন্য কমিটি।
বিতর্কিত বেসরকারি বিল কমিটিসমূহ বহুলাংশে আদালতের কার্যপদ্ধতি অনুসরণ করে। কমিটি বিল সম্পর্কে প্রতিকূল সিদ্ধান্ত দিলে বিলটি বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে, অবিতর্কিত বেসরকারি বিল কমিটি কমন্সসভার স্থায়ী নিয়ম-পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করে।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কমিটিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিটিগুলোর বিস্তারিত আলোচনা, বিচার-বিশ্লেষণ এবং সুচিন্তিত মতামতের ভিত্তিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আইনের উৎকর্ষ সাধিত হয়। যদিও অনেকের মতে, কমিটির মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ফলে পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ ভূমিকার গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে, তবুও প্রকৃতপক্ষে কমিটিগুলোর কার্যকর ভূমিকার কারণে পার্লামেন্টের কাজ অধিকতর সহজ, সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ হয়েছে।

إرسال تعليق