ব্রিটেনের রাজস্ব বা আয়-ব্যয়ের ওপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া আলোচনা কর


প্রশ্ন: ব্রিটেনের রাজস্ব বা আয়-ব্যয়ের ওপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি আলোচনা কর।

ভূমিকা : ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো অর্থবিষয়ক ক্ষমতা। মূলত পার্লামেন্টের প্রতিনিধিত্বশীল কক্ষ কমন্সসভা ব্রিটিশ সরকারের অর্থ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত ক্ষমতা ভোগ করে থাকে। লর্ডসভার আর্থিক বিষয়ে কোনো ক্ষমতা নেই বললেই চলে। ব্রিটিশ সরকার কমন্সসভার অনুমতি ব্যতীত সরকারি রাজকোষ থেকে সামান্য পরিমাণ অর্থও ব্যয় করতে পারে না। এমনকি কমন্সসভার অনুমতি ছাড়া সরকার নতুন কর ধার্য বা ধার্যকৃত করের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে না। অর্থাৎ সরকারের আয়-ব্যয় কমন্সসভাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে সরকারের আয়-ব্যয়ের ওপর পার্লামেন্ট সহজেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অনেকের মতে, কমন্সসভা সরকারের আয়-ব্যয়কে সাফল্যের সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলেই শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।

ব্রিটেনের রাজস্ব বা আয়-ব্যয়ের ওপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি : ব্রিটেনের রাজস্ব বা আয়-ব্যয়ের ওপর পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় কমন্সসভার নিয়ন্ত্রণ। কেননা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ কমন্সসভার অনুমতি ব্যতীত সরকার কোনো প্রকার কর ধার্য, কর সংগ্রহ ও অর্থ ব্যয় করতে পারে না। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট তথা কমন্সসভা যেসব পদ্ধতি বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো—

১. কমন্সসভায় বাজেট পেশ : ব্রিটেনে আর্থিক বছর শুরু হয় ১ এপ্রিল থেকে। ব্রিটেনের সরকারকে প্রত্যেক আর্থিক বছরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট বছরের সম্ভাব্য আয়-ব্যয়ের হিসাব কমন্সসভায় পেশ করতে হয়। এ হিসাবে উল্লেখ থাকে, সরকার কোন কোন সূত্র থেকে আয় করবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তা ব্যয় করবে। রাজস্ব-সংক্রান্ত এ বিবৃতিকে বাজেট বলা হয়। পার্লামেন্টের অনুমোদনের প্রেক্ষিতে সরকার বাজেটে প্রস্তাবিত বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের দাবি করে থাকে।

২. সরবরাহ কমিটি হিসেবে : পার্লামেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে সরকারের অধিকাংশ ব্যয় হয়ে থাকে। অর্থমন্ত্রী কর্তৃক এ ব্যয় বরাদ্দের দাবি কমন্সসভায় পেশ করা হয়। কমন্সসভা সরবরাহ কমিটিতে রূপান্তরিত হয়ে প্রস্তাবিত ব্যয়ের প্রতিটি খাত পর্যালোচনা করে এবং প্রয়োজনে ব্যয় হ্রাস বা বাতিলের জন্য সংশোধনী প্রস্তাব আনয়ন করে থাকে।

৩. উপায় নির্ধারণী কমিটি হিসেবে : সরকারের ব্যয় নির্বাহে কমন্সসভা উপায় নির্ধারণী কমিটি হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের প্রস্তাবিত ব্যয় কোন কোন উৎস থেকে সংকুলান করা হবে, তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কমন্সসভা করে থাকে। কারণ কমন্সসভার অনুমতি ব্যতীত সরকার রাজকোষ থেকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে পারে না। কমন্সসভা উপায় নির্ধারণী কমিটি হিসেবে সরকারকে সঞ্চিত অর্থ তহবিল থেকে ব্যয় করার অনুমতি দিয়ে থাকে। সুতরাং দেখা যায় যে, উপায় নির্ধারণী কমিটি হিসেবে কমন্সসভা সরকারের ব্যয়ের অর্থ সংকুলানের উপায় নির্ধারণ করে দেয়।

৪. তদারকি ব্যবস্থা : কমন্সসভা সরকারের অর্থের সংস্থানই করে না, পাশাপাশি সে অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা তদারকিও করে থাকে। সরকারের ব্যয় তদারকির জন্য কমন্সসভায় তিনটি কমিটি রয়েছে। যথা—

i. নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক
ii. সরকারি গণনাকারী কমিটি এবং
iii. ব্যয় কমিটি।

নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো—

ক. নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক : ১৮৬৬ সালে প্রধানমন্ত্রী গ্লাডস্টোনের সময় থেকে নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক পদটি সৃষ্টি করা হয়েছে। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে রাজা বা রানী নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষককে নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারেন। পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে সরকারের আয়-ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাঁর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষক যেসব দায়িত্ব পালন করেন, তা হলো—

১. কোনো বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সঞ্চিত অর্থ তহবিল থেকে অর্থ ব্যয় করছেন কি না, তা পরীক্ষা করা।
২. সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ব্যয় পরীক্ষা করা।
৩. পার্লামেন্ট যে উদ্দেশ্যে অর্থ বরাদ্দ করেছে, তা উপেক্ষা করে অন্য খাতে ব্যয় করা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা।
৪. বিভিন্ন বিভাগের হিসাব পরীক্ষা করে কমন্সসভায় প্রতিবেদন পেশ করা।

খ. সরকারি গণনাকারী কমিটি : সরকারের বিভিন্ন ব্যয়ের হিসাব এবং নিয়ন্ত্রক ও মহাগণনা পরীক্ষকের প্রতিবেদন পর্যালোচনার জন্য কমন্সসভা যে নিজস্ব কমিটি গঠন করে, তাকেই সরকারি গণনাকারী কমিটি বলা হয়। এ কমিটিকে কমন্সসভার বিশেষজ্ঞ সদস্যদের একটি কমিটি হিসেবেও অভিহিত করা হয়। কমন্সসভার বিভিন্ন দলের ১৫ জন সদস্য নিয়ে এ কমিটি গঠিত হয় এবং অর্থ দপ্তরের সচিব এ কমিটির একজন নিয়মিত সদস্য। এ কমিটির প্রধান দায়িত্ব হলো—

১. পার্লামেন্ট যে খাতে যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করেছে, তা সে খাতে যথাযথভাবে ব্যয় করা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা।
২. সরকারি অর্থের অপব্যয় হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা।
৩. জাতীয় হিসাব-নিকাশ বজায় রাখার পদ্ধতি এবং তার উন্নতির জন্য সুপারিশ করা।
গ. ব্যয় কমিটি :

প্রতি বছর সরকার তার আয়-ব্যয়ের যে হিসাব পার্লামেন্টের নিকট পেশ করে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পূর্ব থেকেই যে কমিটি ছিল, তাকে আনুমানিক ব্যয় হিসাব কমিটি বলা হতো। ১৯৭১ সালের পর এ কমিটির নাম পরিবর্তন করে ব্যয় কমিটি রাখা হয়। এ কমিটির প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সরকারি ব্যয় ও আনুমানিক হিসাব-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নীতিসমূহকে অপেক্ষাকৃত স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা এবং সরকারের ব্যয় বরাদ্দের দাবি হ্রাস করে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা বিচার-বিশ্লেষণ করা।

উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সরকারের আয়-ব্যয় সম্পর্কিত বিষয়ে তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। রাজার ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে অর্থ-সংক্রান্ত ক্ষমতা পার্লামেন্টের হ্রাস করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান কর্মমুখর রাষ্ট্রের পক্ষে এ পদ্ধতি আর উপযোগী নয়। ফলে এ ক্ষমতা প্রয়োগ করছে কেবিনেট। অবশ্য এ কারণে পার্লামেন্ট যে একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করে না, তা ভাবা উচিত নয়; বরং বিরোধী দল কমন্সসভায় সরকারের আয়-ব্যয়ের ব্যাপারে সাধ্যমতো সমালোচনা করে পার্লামেন্টের কার্যকারিতা রক্ষা করে থাকে।

Post a Comment

أحدث أقدم