“ব্রিটেনের লর্ডসভার প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে।” — উক্তিটি বিশ্লেষণ কর


প্রশ্ন: “ব্রিটেনের লর্ডসভার প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে।” — উক্তিটি বিশ্লেষণ কর।

ভূমিকা : গ্রেট ব্রিটেন পৃথিবীর সংসদীয় (Parliamentary) শাসনব্যবস্থার পীঠস্থান। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। লর্ডসভা (House of Lords) ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ এবং এটি দুই কক্ষের মধ্যে প্রাচীনতম। নর্মান যুগের ‘বৃহত্তর পরিষদ’ (Great Council) থেকে বিবর্তিত হয়ে এটি বর্তমান রূপ লাভ করেছে। একসময় লর্ডসভা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ছিল। কিন্তু বর্তমানে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাই অনেকের মতে, এটি একটি অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। Frank Stacey বলেছেন, “The House of Lords is one of the oddities of the British Constitution.”

লর্ডসভার অপ্রয়োজনীয়তা: বর্তমান উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় লর্ডসভার মতো একটি অগণতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বকে অনেকেই অসঙ্গত বলে মনে করেন। Herman Finer, Harold Laski প্রমুখ সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন দিক থেকে লর্ডসভার সমালোচনা করেছেন। অধ্যাপক ফাইনার মন্তব্য করেছেন, “The existence of the House of Lords is a gross anomaly without justification in this era.” নিম্নে লর্ডসভাকে অপ্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনার কারণগুলো আলোচনা করা হলো—

১. অগণতান্ত্রিক গঠন: লর্ডসভার গঠন অত্যন্ত অগণতান্ত্রিক। কারণ এর সদস্যরা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না; বরং উত্তরাধিকার, উপাধি বা মনোনয়নের মাধ্যমে সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে এ কক্ষ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বার্থের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। উত্তরাধিকারসূত্রে সদস্যপদ লাভের কারণে অনেক অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিও এর সদস্য হন। আধুনিক গণতন্ত্রে এ ধরনের ব্যবস্থা অযৌক্তিক বলে বিবেচিত হয়। Sidney Webb এবং Beatrice Webb বলেছেন, “Its decisions are vitiated by its composition. It is the worst representative assembly ever created.”

২. রক্ষণশীল প্রকৃতি: লর্ডসভা প্রকৃতিগতভাবে অত্যন্ত রক্ষণশীল। তারা আইন বা বিলকে নিরপেক্ষ ও বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন না করে অনেক সময় নিজেদের শ্রেণিগত স্বার্থের আলোকে বিচার করে। কায়েমি স্বার্থের বিরোধী হলে তারা জনকল্যাণমূলক আইনও বাধাগ্রস্ত করে। উদাহরণ হিসেবে আইরিশ হোম রুল বিলের বিরোধিতা এবং ১৯০৯ সালে লয়েড জর্জের বাজেট প্রত্যাখ্যানের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। Ramsay Muir বলেছেন, “The House of Lords is the common fortress of wealth.”

৩. বিত্তশালীদের দুর্গ: লর্ডসভা মূলত ব্রিটিশ সমাজের ধনী ও প্রভাবশালী শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। Carter, Ranney এবং Herz উল্লেখ করেছেন, “The House of Lords is not merely representative of wealth and privilege; it is wealth and privilege personified.” Laski বলেছেন, “There is hardly any great national industry in Britain which is not adequately represented in the House of Lords.” ফাইনারের মতে, লর্ডসভার এক-তৃতীয়াংশ সদস্য বড় বড় কোম্পানির পরিচালক। ফলে এটি ধনিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়।

৪. উপস্থিতির হার অত্যন্ত কম: লর্ডসভায় সদস্যসংখ্যা এক হাজারেরও বেশি হলেও নিয়মিত উপস্থিত সদস্যের সংখ্যা খুবই কম। উপস্থিত সদস্যদের মধ্যেও অনেকে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন না। তবে ধনিক শ্রেণির স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিল উত্থাপিত হলে সদস্যদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ১৯১৯ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে ১১১ জন সদস্য কখনো ভোটদানেই অংশ নেননি এবং অর্ধেকেরও বেশি সদস্য কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করেননি।

৫. কার্যকারিতার অভাব: বর্তমানে কার্যত ক্যাবিনেট ও কমন্সসভাই আইন প্রণয়নের প্রধান কেন্দ্র। ফলে লর্ডসভার মতো একটি উচ্চকক্ষের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। জাতীয় স্বার্থের বিরোধী কোনো আইন সহজে পাস হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই জনকল্যাণমূলক সংস্কার বিলম্বিত করার জন্য লর্ডসভাকে বহাল রাখার যৌক্তিকতা দুর্বল।

৬. সদস্যদের অনুপযুক্ততা: লর্ডসভার অনেক সদস্য আইন প্রণয়নের প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ, দক্ষতা বা সামর্থ্য প্রদর্শন করেন না। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় দলীয় তহবিলে অর্থদানের পুরস্কার হিসেবে সদস্যপদ প্রদান করা হয়। আবার অনেক বংশগত পিয়ার জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশায় নিয়োজিত থাকায় নিয়মিত অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে পারেন না।

৭. দায়িত্বহীনতা: লর্ডসভার সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের জনগণের কাছে কোনো প্রত্যক্ষ জবাবদিহি নেই। ফলে অনেক সময় তারা জনমতকে উপেক্ষা করে দায়িত্বহীন আচরণ করেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন একটি অনির্বাচিত কক্ষের অস্তিত্ব অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য।

৮. আপিল আদালত হিসেবে অপরিহার্য নয়: সর্বোচ্চ আপিল আদালতের দায়িত্ব পালনের জন্য লর্ডসভার অস্তিত্ব অপরিহার্য নয়। প্রয়োজনে পৃথক সর্বোচ্চ আদালত গঠন করা সম্ভব। তাই বিচারিক দায়িত্বের অজুহাতে লর্ডসভাকে টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই।

৯. আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সীমিত: ১৯১১ ও ১৯৪৯ সালের Parliament Acts-এর মাধ্যমে লর্ডসভার ক্ষমতা ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে। অর্থবিলের ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর কোনো ক্ষমতা নেই। সাধারণ বিলের ক্ষেত্রেও তারা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত বিলম্ব ঘটাতে পারে। ফলে আইন প্রণয়নে তাদের ভূমিকা অনেকটাই আনুষ্ঠানিক।

১০. জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী: লর্ডসভা প্রগতিশীল ও জনকল্যাণমূলক আইন প্রণয়নে বিলম্ব সৃষ্টি করতে পারে, যা অনেক সময় জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। তাই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নেই।

উপসংহার: উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বর্তমান উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক যুগে লর্ডসভার মতো একটি অগণতান্ত্রিক, রক্ষণশীল ও সীমিত ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিকতা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। এর আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সীমিত, সদস্যরা নির্বাচিত নন এবং এটি প্রায়ই কায়েমি স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে অনেকের মতে, লর্ডসভাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি নেই। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে বিশেষ করে বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ডসভার বিলুপ্তি বা মৌলিক সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন।

Post a Comment

أحدث أقدم