ভূমিকা : প্রশাসনের স্থায়ী কর্মচারী হিসেবে ব্রিটেনের পার্লামেন্টারীয় শাসনব্যবস্থায় আমলাদের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক প্রশাসন পরিচালনা-সম্পর্কিত বিভিন্ন দায়িত্ব আমলাদেরই সম্পাদন করতে হয়। ব্রিটেনের পার্লামেন্টারীয় শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনের মূল ক্ষমতা ও দায়িত্ব মন্ত্রিসভার হাতেই ন্যস্ত থাকে। রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে মন্ত্রীরা সক্ষম হলেও প্রশাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরা আমলাদের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল।
ব্রিটেনের আমলাতন্ত্রের ভূমিকা : এই নির্ভরশীলতার কারণে ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন বা আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে, যা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
১. নীতি প্রণয়নে : ব্রিটেনে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মচারীগণ বিভিন্ন দপ্তরের নীতি প্রণয়নে মন্ত্রীদের সাহায্য করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। নীতি প্রণয়নের জন্য তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের বিন্যাস ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোনো মন্ত্রীর পক্ষেই ব্যক্তিগতভাবে এসব দায়িত্ব গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে তিনি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। প্রশাসনের স্থায়ী উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতার মাধ্যমে মন্ত্রীদের নীতি প্রণয়নে সহায়তা করেন।
২. মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রস্তুত ও প্রশ্নোত্তরে সহায়তা : ব্রিটেনে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ পার্লামেন্টে মন্ত্রীর বক্তব্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ ও বক্তব্য প্রস্তুত করেন। তাছাড়া, পার্লামেন্টে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে মন্ত্রীদের অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা কমন্সসভার নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেন।
৩. বিভাগীয় বিলের খসড়া প্রণয়ন : ব্রিটেনের আমলারাই বিভাগীয় বিলের খসড়া প্রণয়ন এবং খুঁটিনাটি বিষয়ে দায়িত্ব বহন করে থাকেন। কারণ, বিলের খসড়া রচনার জন্য আইনের জ্ঞান ও নৈপুণ্য প্রয়োজন। আর আইনের জ্ঞান ও নৈপুণ্যের দিক দিয়ে আমলাগণ মন্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ।
৪. বিভাগীয় কার্য পরিচালনা : ব্রিটেনে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মচারীগণ দপ্তরের সাধারণ পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ন্যস্ত থাকে। বিভাগের কার্য পরিচালনা ও আচরণবিধি তাঁরাই রচনা করেন। বিভাগের প্রাত্যহিক কার্য পরিচালনার দায়িত্বও তাঁদের হাতে ন্যস্ত থাকে।
৫. স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সংযোগ স্থাপন : ব্রিটেনের স্বার্থসেবী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারের সংযোগ সাধনের ক্ষেত্রেও পদস্থ আমলাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমলারা বিভিন্ন স্বার্থের বিন্যাস ও সমষ্টিবদ্ধকরণের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
৬. রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা : ব্রিটেনের আমলাগণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাষ্ট্রের স্থায়ী কর্মী হিসেবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার মাধ্যমে তাঁরা এ দায়িত্ব পালন করেন।
৭. আধুনিকীকরণ : ব্রিটেনের আমলাতন্ত্র আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তারা তাদের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও অর্জিত দক্ষতার সাহায্যে সরকারি নীতিনির্ধারণ এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
৮. শাসন বিভাগীয় কাজে নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষা : ব্রিটেনে বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো শাসন বিভাগীয় কাজে নিরবচ্ছিন্নতা (Continuity) বজায় রাখা। সেখানে সরকারের পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু বেসামরিক সরকারি কর্মচারীরা পরিবর্তিত না হয়ে পূর্বের মতোই নিজেদের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁরা সর্বদা দলীয় রাজনীতি এবং সরকারের উত্থান-পতনের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থেকে মন্ত্রীদের সাহায্য ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।
৯. আইনের যথাযথ প্রয়োগ : আইন প্রয়োগের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব আমলাদের হাতে ন্যস্ত। আইন, নীতি ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব তাঁরা পালন করেন। এভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে আমলাগণ সরকারের প্রাত্যহিক কাজ সম্পাদন করে থাকেন।
১০. বিচারসংক্রান্ত কার্যাবলি : ব্রিটেনের আমলাগণ বিচারসংক্রান্ত কার্যাবলিও সম্পাদন করে থাকেন। যেমন—ট্রেডমার্ক ও জমি ক্রয়-বিক্রয়ের রেজিস্ট্রি করা ইত্যাদি। তাছাড়া, আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা এবং আদালতের আইন অনুসারে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করাও তাঁদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
১১. মন্ত্রীদের পরিপূরক হিসেবে : মন্ত্রিগণ হলেন রাজনৈতিক শাসক এবং আমলাগণ হলেন অরাজনৈতিক প্রশাসক। ফলে মন্ত্রীদের কাছে রাজনৈতিক বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মন্ত্রিগণ যাতে রাজনৈতিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব না দেন, সে কারণে আমলাগণ তাঁদের সঠিক পরামর্শ প্রদান করেন। ফলে তাঁরা জনকল্যাণে কাজ করতে সক্ষম হন।
১২. মন্ত্রীদের নীতির বিরোধিতা : ব্রিটেনের মন্ত্রিগণ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি প্রণয়ন করেন, তা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে। প্রয়োজনে আমলারা মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে থাকেন। এক্ষেত্রে মন্ত্রিগণ আমলাদের পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য না হলেও তাঁদের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করতে পারেন না।
১৩. তথ্য প্রকাশ : আইনসভা ও এর বিভিন্ন কমিটি এবং শাসন বিভাগ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেগুলোর জন্য বিভিন্ন তথ্যের প্রয়োজন হয়। আমলাগণই দেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে ব্রিটেনের আমলাগণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ব্রিটেনের বেসামরিক প্রশাসন এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। বর্তমানে এরা প্রশাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সরকারের রাজনৈতিক ক্ষমতার বাস্তব প্রয়োগ আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ বা নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে নয়, বরং সিভিল সার্ভিসের মাধ্যমেই হয়ে থাকে। বেসামরিক সরকারি কর্মচারীগণ রাষ্ট্রের সব ধরনের আইন কার্যকর করেন এবং সরকারকে জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন।

إرسال تعليق