ভূমিকা : আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি কর্মচারীদের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ব্রিটেনও এর ব্যতিক্রম নয়। সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলিত থাকায় ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থা পরিচালনায় প্রকৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব ন্যস্ত ক্যাবিনেটের হাতে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে, ক্যাবিনেটের কার্যাবলি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এর নেপথ্যে একটি সংস্থা কাজ করে। আর এ সংস্থাই হলো ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস। এ সংস্থা এমন এক শ্রেণির কর্মচারী নিয়ে গঠিত, যারা নির্ধারিত হারে বেতন পান, বিভিন্ন কাজে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং যাদের চাকরিকাল স্থায়ী। এরাই ব্রিটিশ প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি। এ সংস্থা সম্পর্কে গ্রাহাম ওয়ালাস মন্তব্য করেন, “এ ব্যবস্থার সৃষ্টিই ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উদ্ভাবন।”
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা : ব্রিটেনের পার্লামেন্টারীয় শাসনব্যবস্থায় প্রশাসনের মূল ক্ষমতা ও দায়িত্ব মন্ত্রিসভার হাতেই ন্যস্ত থাকে। মন্ত্রিগণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনে সক্ষম হলেও প্রশাসনব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁরা তেমন দক্ষ নন। এক্ষেত্রে মন্ত্রিগণকে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ। তাই ব্রিটেনের শাসনব্যবস্থায় সিভিল সার্ভিসের ব্যাপক ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা আলোচনা করা হলো :
১. মন্ত্রীদের বক্তব্য প্রস্তুত এবং প্রশ্নোত্তরে সহায়তা : ব্রিটেনে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ পার্লামেন্টে মন্ত্রীর বক্তব্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব তথ্য সরবরাহ ও বক্তব্য প্রস্তুত করেন। তাছাড়া, পার্লামেন্টে সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর তৈরি করে মন্ত্রীদের অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁরা কমন্সসভার নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেন।
২. নীতি প্রণয়নে : ব্রিটেনে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মচারীগণ বিভিন্ন দপ্তরের নীতি প্রণয়নে মন্ত্রীদের সাহায্য করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। নীতি প্রণয়নের জন্য তথ্য সংগ্রহ, তথ্যের বিন্যাস ও ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কোনো মন্ত্রীর পক্ষেই ব্যক্তিগতভাবে এসব দায়িত্ব গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে তিনি প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। প্রশাসনের স্থায়ী উচ্চপদস্থ কর্মচারীগণ দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও পারদর্শিতার মাধ্যমে মন্ত্রীদের নীতি প্রণয়নে সহায়তা করেন।
৩. শাসন বিভাগীয় কাজে নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষা : ব্রিটেনে বেসামরিক সরকারি কর্মচারীদের একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো শাসন বিভাগীয় কাজে নিরবচ্ছিন্নতা (Continuity) বজায় রাখা। সেখানে সরকারের পরিবর্তন ঘটতে পারে, কিন্তু বেসামরিক সরকারি কর্মচারীরা পরিবর্তিত না হয়ে পূর্বের মতোই নিজেদের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তাঁরা সর্বদা দলীয় রাজনীতি এবং সরকারের উত্থান-পতনের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থেকে মন্ত্রীদের সাহায্য ও সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।
৪. বিভাগীয় বিলের খসড়া প্রণয়ন : ব্রিটেনের আমলারাই বিভাগীয় বিলের খসড়া প্রণয়ন এবং খুঁটিনাটি বিষয়ে দায়িত্ব বহন করে থাকেন। কারণ, বিলের খসড়া রচনার জন্য আইনের জ্ঞান ও নৈপুণ্য প্রয়োজন। আর আইনের জ্ঞান ও নৈপুণ্যের দিক দিয়ে আমলাগণ মন্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ ও অভিজ্ঞ।
৫. বিভাগীয় কার্য পরিচালনা : ব্রিটেনে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মচারীগণ দপ্তরের সাধারণ পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। সরকারের নীতি, সিদ্ধান্ত ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব তাঁদের হাতে ন্যস্ত থাকে। বিভাগের কার্য পরিচালনা এবং আচরণবিধি তাঁরাই রচনা করেন। বিভাগের প্রাত্যহিক কার্য পরিচালনার দায়িত্বও তাঁদের হাতে ন্যস্ত থাকে।
৬. আইনের যথাযথ প্রয়োগ : আইন প্রয়োগের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিচালনার দায়িত্ব আমলাদের হাতে ন্যস্ত। আইন, নীতি ও সিদ্ধান্ত কার্যকর করার দায়িত্ব তাঁরা পালন করেন। এভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে আমলাগণ সরকারের প্রাত্যহিক কাজ সম্পাদন করে থাকেন।
৭. মন্ত্রীদের পরিপূরক হিসেবে : মন্ত্রিগণ হলেন রাজনৈতিক শাসক এবং আমলাগণ হলেন অরাজনৈতিক প্রশাসক। ফলে মন্ত্রিগণের কাছে রাজনৈতিক বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মন্ত্রিগণ যাতে রাজনৈতিক বিষয়কে বেশি গুরুত্ব না দেন, সে কারণে আমলাগণ তাঁদের সঠিক পরামর্শ প্রদান করেন। ফলে তাঁরা জনকল্যাণে কাজ করতে সক্ষম হন।
৮. বিচারসংক্রান্ত কার্যাবলি : ব্রিটেনের আমলাগণ বিচারসংক্রান্ত কার্যাবলিও সম্পাদন করে থাকেন। যেমন—ট্রেডমার্ক ও জমি ক্রয়-বিক্রয়ের রেজিস্ট্রি করা ইত্যাদি। তাছাড়া, আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা এবং আদালতের আইন অনুসারে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করাও তাঁদের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
৯. মন্ত্রীদের নীতির বিরোধিতা : ব্রিটেনের মন্ত্রিগণ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি প্রণয়ন করেন, তা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে। প্রয়োজনে আমলারা মন্ত্রীদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে থাকেন। এক্ষেত্রে মন্ত্রিগণ আমলাদের পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য না হলেও তাঁদের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করতে পারেন না।
১০. তথ্য প্রকাশ : আইনসভা ও এর বিভিন্ন কমিটি এবং শাসন বিভাগ যেসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেগুলোর জন্য বিভিন্ন তথ্যের প্রয়োজন হয়। আমলাগণই দেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে থাকেন। এছাড়া, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে ব্রিটেনের আমলাগণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
উপসংহার : উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যবস্থার জটিলতাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক কাজকর্মও জটিল রূপ ধারণ করেছে। এমতাবস্থায় সরকারের একার পক্ষে দেশের প্রশাসনিক কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাগণ সরকারের মন্ত্রীদের সার্বিকভাবে সাহায্য করে থাকেন। সিভিল সার্ভিসের সহযোগিতা ছাড়া কোনো দপ্তরের মন্ত্রীই তাঁর দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে সক্ষম হন না। মন্ত্রীদের পরামর্শ প্রদান থেকে শুরু করে আমলাগণ সরকারি নীতিনির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। তাই S. E. Finer মন্তব্য করেন, “In a parliamentary government, the ministers must of necessity be a paramount amateur and the civil servant a paramount expert.”

إرسال تعليق